MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। সেই নিরিখে জাতীয় বাজেটে উচ্চশিক্ষায় বড় অংকের বরাদ্দ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান বাস্তবতাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে—এই বিপুল বাজেটের সুফল কি কেবল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই একচেটিয়া ভোগ করবে, নাকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এর অংশীদার করা হবে? যদি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের সুফল একমাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য ও বঞ্চনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি বিশাল অংশ পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে বাধ্য হন। এসব শিক্ষার্থীর পরিবারও রাষ্ট্রের নিয়মিত করদাতা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে সমানভাবে অবদান রাখে। ফলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সুফল থেকে তাদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়।
গবেষণা, উন্নয়ন তহবিল ও অবকাঠামোয় অসমতা: উচ্চশিক্ষার মূল প্রাণশক্তি হলো গবেষণা ও উদ্ভাবন। জাতীয় বাজেট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে গবেষণার জন্য যে বিপুল তহবিল বরাদ্দ করা হয়, তার সিংহভাগই চলে যায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাকাউন্টে। অথচ দেশের বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব অর্থায়নে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা করছে এবং বৈশ্বিক র্যাং কিংয়েও নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছে। তবুও তারা সরকারি গবেষণা অনুদান, উদ্ভাবনী প্রকল্প কিংবা প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা তহবিলে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হয়।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য অত্যন্ত স্পষ্ট। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থায়ী ক্যাম্পাস, আধুনিক গবেষণাগার ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার নির্মাণে মেগাপ্রকল্পের সুবিধা পায়। অপরদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্পূর্ণ নিজস্ব টিউশন ফি ও আয়ের ওপর নির্ভর করে এই বিশাল ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়, যার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর।
মাথাপিছু ব্যয়, করের চাপ ও নীতিগত সুযোগের বঞ্চনা: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্র যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তার সামান্য অংশও পায় না। এর ওপর যুক্ত হয়েছে কর ও ভ্যাটের মানসিকতা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইনগতভাবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও প্রায়ই তাদের ওপর কর বা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব আসে, যা শিক্ষা খাতকে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সংকীর্ণ মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
নীতিগত সুযোগের ক্ষেত্রেও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পরও পিএইচডি প্রোগ্রাম (PhD Program) পরিচালনা, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা কিংবা একাডেমিক সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমপর্যায়ের সুযোগ পায় না। এমনকি সরকারি বাজেটের আওতায় শিক্ষকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ, ফেলোশিপ ও শিক্ষক জ্ঞান বিনিময় কর্মসূচিতেও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নগণ্য।
বৈষম্য দূরীকরণে কিছু জরুরি প্রস্তাব: জাতীয় উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নকে শুধুমাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক চিন্তা করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসবে না। একটি সুষম ও সমন্বিত উচ্চশিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি: ১. জাতীয় গবেষণা তহবিল গঠন: বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা বিবেচনা না করে গবেষণার গুণগত মান ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি সবার জন্য একটি উন্মুক্ত কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন করা। ২. অবকাঠামো উন্নয়নে স্বল্পসুদে ঋণ: স্থায়ী ক্যাম্পাস ও আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি গড়ার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণের সুযোগ দেওয়া। ৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মেধাভিত্তিক অর্থায়ন: সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত দেশে-বিদেশের উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সেমিনারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা বা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষা অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এমন কৃত্রিম বিভাজন করা হয় না। উচ্চশিক্ষায় বড় বাজেট বরাদ্দ তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর সুফল দেশের সমগ্র উচ্চশিক্ষা খাতে পৌঁছাবে। রাষ্ট্রের বিনিয়োগের মূল দর্শন হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নয়; বরং শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মানবকল্যাণের সমন্বিত রূপান্তর। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শনের বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি দক্ষ, উদ্ভাবনী ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।