শাকীরিন| কালবিন্দু| মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
বিশ্বে যখন
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নানা রকম চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন সাহস, সততা ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের
প্রতীক হয়ে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা
মাচাদো।
নরওয়ের রাজধানী
অসলোতে নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়, “ভেনেজুয়েলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায়
মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নিরলস, শান্তিপূর্ণ ও সাহসী সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ২০২৫
সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হলো।”
মাচাদো হলেন সেই কণ্ঠ, যিনি বছরের পর বছর ধরে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়েছেন, দমন-পীড়নের মুখেও পিছপা হননি এবং অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপসহীন থেকেছেন।
১৯৬৭ সালে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে জন্ম নেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো। তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেছেন দেশটির অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিমন বলিভার ইউনিভার্সিটিতে। পরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে।
পড়াশোনার পাশাপাশি
তার মধ্যে জন্ম নেয় সামাজিক দায়িত্ববোধ। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অবস্থা, দুর্নীতি এবং
মানুষের ভোগান্তি তাকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়।
২০০২ সালে তিনি গড়ে তোলেন Súmate নামে একটি নাগরিক সংগঠন, যার উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করা এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করা।
সুমাতে বিশেষভাবে
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ২০০৪ সালের গণভোটে, যেখানে প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের অপসারণের
দাবিতে দেশের জনগণ অংশ নেয়। এ সময় মাচাদো ছিলেন অন্যতম সংগঠক।
এই ভূমিকার
জন্য শাভেজ সরকার তাকে রাষ্ট্রদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক
মহলের চাপে তাকে কারাবন্দি করা হয়নি। বরং, তিনি হয়ে ওঠেন গণতন্ত্রের নতুন মুখ।
২০১০ সালে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। সংসদে তার প্রবেশ ছিল ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তির কারণ। তিনি ছিলেন মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় ও স্পষ্ট কণ্ঠস্বর।
তবে ২০১৪ সালে
সরকার তাকে সংসদ থেকে বহিষ্কার করে। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক নিষেধাজ্ঞা, মামলা এবং
রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার চেষ্টাও চলে।
তবুও থেমে থাকেননি মাচাদো। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, “গণতন্ত্র কখনও অস্ত্রের কাছে হার মানে না, যদি মানুষের ইচ্ছা সত্যিকারের শক্তি হয়ে ওঠে।”
ভেনেজুয়েলায় মাদুরো সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিরোধিতা করা মানে ছিল জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা। অনেক বিরোধী নেতা নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন, কেউ কেউ গ্রেফতার হন, কেউ নিখোঁজ।
মারিয়া কোরিনা
মাচাদো সব ঝুঁকি জেনেও দেশে থেকেই আন্দোলন চালিয়ে যান। তিনি সরাসরি নির্বাচন চেয়ে জনগণের
সঙ্গে মিছিল করেছেন, গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে ভেনেজুয়েলার
পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন।
২০২৩ সালে দেশটির
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে সরকার তার প্রার্থিতা বাতিল করে। কারণ
দেখানো হয় ‘জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ’। এই সিদ্ধান্ত
দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হয়।
তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। বরং আরও বৃহত্তর পরিসরে গণআন্দোলন গড়ে তোলেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া মানে শুধু একটি ব্যক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়; এটি একটি সংগ্রাম, একটি মূল্যবোধ, এবং একটি লক্ষ্যের স্বীকৃতি।
নোবেল কমিটি
বলেছে,
“মারিয়া কোরিনা
মাচাদো তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলার
জনগণের পাশে থেকেছেন। তার নেতৃত্ব প্রমাণ করে গণতন্ত্র রক্ষা করতে সাহসই সবচেয়ে বড়
অস্ত্র।”
এই পুরস্কার শুধু মাচাদোর জন্য নয়, বরং এটি ভেনেজুয়েলার সেই জনগণের জন্য যারা দমন-পীড়নের মধ্যেও নিজেদের মত প্রকাশের অধিকার, ভোটাধিকার ও ন্যায়ের জন্য লড়ছেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় মারিয়া কোরিনা মাচাদো বলেন,
“এই পুরস্কার
আমার একার নয়, এটি ভেনেজুয়েলার প্রতিটি সাহসী নারীর, যুবকের, কর্মজীবী মানুষের, যারা
গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেন। এটি প্রমাণ করে আমরা একা নই, বিশ্ব আমাদের শুনছে।”
তার এই বক্তব্যে যেমন আত্মবিশ্বাস ছিল, তেমনি ছিল এক সতর্ক বার্তা গণতন্ত্র কেবল প্রতিষ্ঠা করলেই চলে না, তাকে রক্ষা করতে হয় প্রতিনিয়ত, প্রতিদিন।
মারিয়া কোরিনা
মাচাদো আজ শুধু ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রের নেত্রী নন, তিনি সারাবিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষের
অনুপ্রেরণা।
যে সময়ে মত
প্রকাশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বেড়ে চলেছে, সেই সময় একটি সাহসী
নারী কণ্ঠের এই স্বীকৃতি বিশ্বের জন্য আশাবাদের বার্তা।
মারিয়া কোরিনা
মাচাদো আজ সেই দীপ্ত শিখার প্রতীক, যার আলোয় এগিয়ে চলবে আগামী দিনের গণতন্ত্রের পথযাত্রা।