প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:২৮ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:১১ পি.এম
লাভলু সরকার| কালবিন্দু| মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
ছোটগল্প | গল্পকার : তানিসা তন্ময় নীহারিকা
গ্রামের নাম মধুপুর। নামটা যেমন মিষ্টি, তেমনি এখানকার মানুষের
জীবনও একসময় ছিল মধুর। সবুজ মাঠ, সরিষার হলুদে মাখা প্রান্তর, চারদিকে কলকল ধ্বনিতে
বয়ে চলা ছোট ছোট খাল। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য কেবলই স্মৃতিতে। তিন বছর ধরে এখানে বৃষ্টি
ঠিকমতো হয় না। খালগুলো শুকিয়ে গেছে, মাঠে ফাটল ধরেছে, নদীর বুকে বালুচর উঠেছে। মানুষজনের
চোখে আজ শুধু অপেক্ষা চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা, কখন নামবে বর্ষা।
মধুপুরের বৃদ্ধ কৃষক রহিম মিয়া প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে
আকাশের দিকে তাকান। কপালে হাত চেপে সূর্যের আলোয় চোখ ছোট করে দেখেন একটিও কালো মেঘ
আছে কি না। তারপর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন। স্ত্রী আয়েশা তখন হাঁড়িতে পানি ঢেলে বলেন,
“আজও বৃষ্টি নাই, তাই না?”
রহিম মিয়া হেসে বলেন,
“না রে আয়েশা, চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে তাকাই, কিন্তু মেঘ তো কেবলই হাওয়া।”
তাদের একমাত্র ছেলে রুবেল শহরে কাজ করে, মাসে একবার টাকা
পাঠায়। কিন্তু সেই টাকায় পেট চলে না। ধানক্ষেত শুকিয়ে গেছে, পুকুরের পানি অর্ধেকেরও
কম। গরু-বাছুর বিক্রি করে তারা টিকে আছে।
একদিন দুপুরে রহিম মিয়া পাশের বাড়ির কৃষক মানিকের সঙ্গে বসে
কথা বলছিলেন।
মানিক বলল, “এইভাবে চললে তো আমরা মরেই যাব। আকাশে মেঘ নেই, নদীতে পানি নেই। সরকার নাকি
গভীর নলকূপ বসাবে, কিন্তু কই? শুধু কাগজে লিখে রাখে।”
রহিম মিয়া নীরব থাকলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন,
“যেদিন প্রথম বৃষ্টি হবে, সেদিন আমি খালি গায়ে মাটিতে গিয়ে দাঁড়াব। মাটির গন্ধটা বুকভরে
নিব। তিন বছর হলো সেই গন্ধ পাই না।”
ঢাকার অদূরে এক পোশাক কারখানায় কাজ করে রুবেল। সকাল থেকে
রাত পর্যন্ত মেশিনের শব্দে তার মাথা ধরেই থাকে। ছয়তলার ছোট্ট ঘরে আরও তিনজন সহকর্মী
থাকে। রাতে ঘুমাতে গেলেও মায়ের মুখটা চোখে ভাসে।
প্রতিদিন ফোনে কথা হয় না, কিন্তু সপ্তাহে একদিন মা ফোন করেন
“বাবা, বৃষ্টি নাই রে। গাছপালা মরতেছে। খেজুরপাতা শুকায় গেছে। তুই একটু আল্লাহর কাছে
দোয়া কর, যেন পানি পড়ে।”
রুবেল চুপ করে থাকে। শহরে থেকে সে আকাশের দিকে তাকানোর সময় পায় না, কিন্তু যখন কারখানার
ছাদে কাপড় শুকাতে যায়, তখন মেঘহীন আকাশ দেখে বুকের মধ্যে কেমন যেন হাহাকার জাগে।
এক রাতে সে স্বপ্নে দেখে, তার গ্রামের খালে পানি বইছে, ছোটবেলার
মতো সে ডুব দিচ্ছে আর আয়েশা মা হাসছেন। হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় কিন্তু জানালা
খুলে দেখে, বাইরে আকাশ ফেটে যাচ্ছে আলোর ঝলকে, তবু বৃষ্টি নেই।
মধুপুরে ততদিনে পরিস্থিতি ভয়াবহ। খরায় ফসলহানি, মানুষ কাজ
হারিয়েছে। শিশুদের মুখে পুষ্টিকর খাবার নেই, রোগ ছড়াচ্ছে। গ্রাম্য হাটে এখন আর ধান
বা শাকসবজির গন্ধ নেই কেবল শুকনো মরিচ আর খোসা-মারা আলুর স্তূপ।
গ্রামের স্কুলশিক্ষক সেলিম সাহেব প্রতিদিন ক্লাসে শিশুদের
বলেন,
“বাচ্চারা, বৃষ্টি হলো প্রকৃতির আশীর্বাদ। একে অবহেলা করো না।”
এক ছাত্র উঠে বলে, “স্যার, আমরা তো তিন বছর ধরে বৃষ্টি দেখি না। বইয়ে বৃষ্টির ছবি দেখি,
কিন্তু সত্যি কেমন তা জানি না।”
সেলিম সাহেবের গলা ধরে আসে, তিনি চুপচাপ ব্ল্যাকবোর্ডে লিখেন ‘চাতক পাখির মতো চেয়ে
থাকি, কখন আসবে বর্ষা ঋতু।’
রহিম মিয়ার স্ত্রী আয়েশা প্রতিদিন মসজিদের পেছনের পুরোনো
বটগাছের নিচে গিয়ে নামাজ শেষে দোয়া করেন। তার দোয়ায় কেবল একটি বাক্য “হে আল্লাহ, পানি
দে, বৃষ্টি দে, আমাদের মাটি বাঁচে।”
গ্রামের লোকেরা বলে, “আয়েশার চোখের পানিতে যদি মাঠ ভিজত, তবে এখন ধান উঠত।”
একদিন বিকেলে পশ্চিম আকাশে কালচে মেঘ দেখা গেল। লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে চেয়ে রইল। বাচ্চারা
হাত উঁচু করে চিৎকার করল “বৃষ্টি আসবে, বৃষ্টি আসবে!”
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই বাতাস উড়ে গেল, মেঘ সরে গেল দূরে।
আয়েশা তখন বারান্দায় বসে কাঁদছিলেন। রহিম মিয়া পাশে এসে বললেন,
“আল্লাহ সময় দেন, আয়েশা। চাতক যেমন ধৈর্য রাখে, তেমনি আমরাও রাখব।”
কয়েকদিন পর ডাকপিয়ন এসে এক খাম দিয়ে গেল। রুবেলের চিঠি। তাতে
লেখা
“আব্বা-আম্মা, আমি বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি।
কারখানায় বেতন পেলে কিছু টাকা পাঠাবো। শুনেছি সরকার নাকি মধুপুরে একটা ছোট ড্যাম বানাবে।
যদি সত্যি হয়, তাহলে আর খরা থাকবে না। আম্মা, তুমি কেঁদো না। আমি একদিন নিজের হাতে
তোমার ক্ষেতের ধান কেটে দেব। শুধু একটু অপেক্ষা করো, বর্ষা আসবেই।”
চিঠি পড়ে রহিম মিয়ার চোখ ভিজে যায়। তিনি ভাবেন, “ছেলেটা শহরে
থেকেও এই গ্রামের কথা ভোলে নাই।”
পরের সপ্তাহে গ্রামে কিছু সরকারি লোক আসে। তারা মাটি পরীক্ষা
করে, কয়েক জায়গায় কূপ খোঁড়ে। মানুষজনের মুখে আশার আলো জ্বলে ওঠে। শিক্ষক সেলিম সাহেব
বলেন, “দেখা যাচ্ছে, এবার হয়তো প্রকৃতি দয়া করবে।”
তবে রহিম মিয়া বলেন, “মানুষ যত চেষ্টা করুক, শেষ কথা তো প্রকৃতিই বলে।”
এদিকে, রাতের আকাশে ধীরে ধীরে বদল আসছে। পূর্ব দিগন্তে মেঘ
জমছে, পাখিরা অস্থির, গাছের পাতায় ভিজে বাতাসের গন্ধ। এক সকালে গ্রামের প্রবীণ হাফিজ
সাহেব বলেন, “আজ মনে হয় কিছু একটা হবে।”
বিকেলের দিকে হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে গেল আকাশ। বাতাস বইতে শুরু
করল, নারকেল গাছ দুলছে, মাঠের ধুলা উড়ছে। তারপরই বিদ্যুতের চমক, বজ্রের গর্জন এবং এক
ফোঁটা, দুই ফোঁটা, তারপর ঝমঝম বৃষ্টি!
গ্রামের সবাই ছুটে বেরিয়ে এল। কেউ মাথা উঁচু করে বৃষ্টির
ধারা গায়ে নিচ্ছে, কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে। বাচ্চারা খালি পায়ে মাঠে দৌড়াচ্ছে। রহিম
মিয়া কথা মতো খালি গায়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ! তিন বছর পর এই গন্ধটা পেলাম।”
আয়েশা বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাচ্ছিলেন, তবু পরোয়া করলেন না।
তার চোখের পানি আর বৃষ্টির ফোঁটা মিশে গেল একসাথে।
দুই সপ্তাহ পর রুবেল গ্রামে ফিরে এল। বৃষ্টি তখন নিয়মিত পড়ছে,
খালে পানি উঠেছে, মাঠে চারা লাগানো শুরু হয়েছে। রুবেল দেখে, গ্রামের মানুষ আবার হাসছে।
রহিম মিয়া ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “দেখলি, শেষমেশ বর্ষা এল।”
রুবেল হাসল, “চাতক পাখিও তো শেষ পর্যন্ত মেঘ দেখে খুশি হয়।”
সে দেখে মা বারান্দায় বসে শুকনো জামা সেলাই করছেন। কাছে গিয়ে
বলল,
“আম্মা, এবার আমি শহরে ফিরব না। এখানে থেকে চাষাবাদ করব। নতুন জীবন শুরু করব।”
আয়েশা অবাক হয়ে বলে, “বাবা, তোর শহরে তো কাজ আছে।”
রুবেল মাথা নেড়ে বলে, “না আম্মা, শহরে মেশিনের শব্দে মন ডুবে যায়। কিন্তু এখানে মাটির
গন্ধে আমি বাঁচতে পারব।”
পরবর্তী মাসগুলোতে গ্রামের চেহারা পাল্টে যায়। ক্ষেতগুলো
সবুজে ভরে ওঠে, খালে মাছ লাফায়, স্কুলে আবার শিশুদের হাসি শোনা যায়। সেলিম সাহেব বোর্ডে
লিখে রাখেন “বৃষ্টি এসেছে, জীবন ফিরেছে।”
রহিম মিয়া প্রতিদিন সকালে ছেলেকে নিয়ে মাঠে যান। একদিন মাঠে
দাঁড়িয়ে বলেন,
“রুবেল, মনে রাখিস, খরা যেমন আমাদের ধৈর্য শেখায়, তেমনি বৃষ্টি শেখায় কৃতজ্ঞতা।”
রুবেল হাসে, “ঠিকই বলছেন আব্বা, চাতকের মতো অপেক্ষা না করলে আমরা বৃষ্টির মিষ্টি বুঝতাম
না।”
বর্ষার টানা বৃষ্টি শেষে যখন রোদ ওঠে, তখন গ্রামের মানুষ
উৎসব করে। পুকুরে মাছ ধরা, মাঠে কাদায় খেলাধুলা সবকিছুতে যেন নতুন প্রাণ। রুবেল এখন
গ্রামের কৃষক, পাশে তার বৃদ্ধ বাবা, খুশির আলোয় মুখ ভরে থাকা মা।
এক সন্ধ্যায় তারা তিনজন বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকালেন।
বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু মাটির গন্ধ এখনো বাতাসে ভাসছে। রহিম মিয়া ধীরে ধীরে বলেন,
“দেখছিস রে রুবেল, জীবনটা আসলে চাতক পাখির মতোই। তৃষ্ণা না থাকলে তৃপ্তির মানে বোঝা
যায় না।”
রুবেল মৃদু হেসে বলে, “তৃষ্ণার শেষে এই বর্ষাই তো জীবনের সবচেয়ে বড় দান।”
আয়েশা চোখ বন্ধ করে দোয়া করলেন
“হে আল্লাহ, আমাদের যেন সবসময় এই বর্ষার মতো করুণা দাও।”
মধুপুরের আকাশে তখন লাল সূর্য ডুবে যাচ্ছে, পাখিরা গাছের
ডালে ফিরছে। খালের বুকে জলের ঢেউ ঝলমল করছে, দূরে কোথাও এক চাতক পাখি গান গাইছে
“বৃষ্টি এসো, জীবন দাও, আশার সুরে ভরাও পৃথিবী।”
আর গ্রামের প্রতিটি মানুষ সেই সুরে মুগ্ধ হয়ে যেন মনে মনে
বলে উঠল
“চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকি, অবশেষে এল যে বর্ষা ঋতু।”