Md. Ibrahim K Mridda| কালবিন্দু| মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
প্রগতিশীল চিন্তা, মানবিক দর্শন আর নিরলস সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের এক উজ্জ্বল নাম যতীন সরকার। বুধবার বিকাল পৌনে ৩টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামে ১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই শিক্ষক, লেখক ও চিন্তাবিদ পরবর্তীতে জেলা শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডে ‘বানপ্রস্থ’ নামের নিজ বাসভবনে বসবাস শুরু করেন। আজ সেই শহরজুড়ে শোকের ছায়া— রাস্তায়, গলিতে, চায়ের আড্ডায়, সর্বত্রই উচ্চারিত হচ্ছে এক নাম— যতীন সরকার।
জীবনের শেষ দিকে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত জুনে এক দুর্ঘটনায় উরুর হাড়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে শারীরিক অবস্থা অবনতি ঘটে। তবে শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব ছিল স্পষ্ট ও প্রাণবন্ত।
কৈশোর থেকেই তিনি দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন। টিউশনি করে, ছোটখাটো কাজ করে নিজের শিক্ষার ব্যয় মেটাতেন। ছাত্রজীবনে ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী— নেত্রকোণা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালীনই ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন।
শিক্ষকতা জীবনের সূচনা আশুজিয়া হাই স্কুলে, পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন শেষে যোগ দেন নাসিরাবাদ কলেজে। দীর্ঘ চার দশক শিক্ষকতা করেছেন এই প্রতিষ্ঠানে। তাঁর ক্লাসরুম কেবল পাঠদানের জায়গা ছিল না— ছিল মুক্তচিন্তা, যুক্তি আর মানবিকতার আলোয় ভরা এক বিদ্যালয়।
প্রায় ছয় দশক ধরে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা চালিয়ে গেছেন তিনি। রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তায় তাঁর গভীর উপস্থিতি তাঁকে পরিণত করেছে এক প্রজন্মের প্রেরণায়। দুই মেয়াদে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি লিখেছেন আড়াই ডজনেরও বেশি বই, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা, পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন, বাংলাদেশী কাবি গান, বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংগ্রাম। এসব রচনায় রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মানবতার মেলবন্ধনে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক গভীর চিন্তার ভুবন।
তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০০৮) ও স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১০)। কিন্তু যতীন সরকারকে সত্যিকারভাবে বড় করে তুলেছে তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকার অদ্ভুত ক্ষমতা।
বুধবার বিকেলে ময়মনসিংহে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাত সাড়ে আটটায় তাঁর মরদেহ পৌঁছায় নেত্রকোনায়। প্রথমে শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয় মরদেহ। সেখানে জনসাধারণের ঢল নামে— কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে, কেউবা চোখ মুছে।
পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় উদীচী কার্যালয়ে, যেখানে সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এরপর সাতপাই রামকৃষ্ণ মিশনে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর প্রিয় বাসভবন ‘বানপ্রস্থ’-এ নিয়ে যাওয়া হয়।
রাত ১টায় নেত্রকোনা কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে তাঁর দেহ দাহ সম্পন্ন হয়। চিতার আগুনে নিভে গেছে দেহ, কিন্তু যতীন সরকারের শিক্ষা, চিন্তা ও মানবিকতার আলো নিভবে না কোনোদিন।