লাভলু সরকার| কালবিন্দু| রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
রিপোর্টার:
মো: তুহিনুল ইসলাম
(বোয়ালমারী, ফরিদপুর)
জাতিসংঘের
সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে দ্বিতীয়বারের
মতো বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভাষণ দিয়েছেন। সদ্য
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের
নতুন সরকারের পক্ষে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি তুলে ধরেছেন
একটি রূপান্তরিত, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র
গঠনের অভিযাত্রা। একইসঙ্গে তিনি বিশ্ব নেতৃত্বের
সামনে তুলে ধরেছেন বৈশ্বিক
সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা, রোহিঙ্গা ইস্যু, গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক
বিষয়। ভাষণের শুরুতে তিনি স্মরণ করিয়ে
দেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ
এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার গৌরবময় ইতিহাস। এরপর বলেন, দীর্ঘ
পাঁচ দশকের পথচলায় নানা চড়াই-উতরাই
পেরিয়ে বাংলাদেশ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে
এক যুগান্তকারী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি
দমনমূলক সরকারের অবসান ঘটায়। এই অভ্যুত্থান ছিল
জনতার দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, বৈষম্য, দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীন শাসনের
বিরুদ্ধে এক স্পষ্ট অবস্থান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর গঠিত হয়
বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজভিত্তিক
অন্তর্বর্তী সরকার, যার প্রধান হিসেবে
দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ইউনূস।
জাতিসংঘের মঞ্চে তিনি বলেন, বাংলাদেশ
এখন এক নবযাত্রায়। এই
যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গণতন্ত্র, জবাবদিহি, মানবিক মর্যাদা এবং টেকসই উন্নয়ন।
তিনি তুলে ধরেন, অন্তর্বর্তী
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের ভঙ্গুর রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনে একাধিক ক্ষেত্রভিত্তিক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করে। শাসনব্যবস্থা,
নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা ও নারী অধিকারসহ
মোট ১১টি খাতে গঠন
করা হয় স্বাধীন সংস্কার
কমিশন। প্রতিটি কমিশন জনমত ও বিশেষজ্ঞ
মতামতের ভিত্তিতে সুপারিশ তৈরি করেছে। সেই
সুপারিশকে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক
সমাজের সম্মিলনে বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির জন্য গঠন করা
হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই কমিশনের মাধ্যমে
সরকার সব রাজনৈতিক দলের
সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায়
গৃহীত হয় ‘জুলাই ঘোষণা’
নামক এক ঐতিহাসিক দলিল,
যেখানে দলমত নির্বিশেষে সব
পক্ষ সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ অঙ্গীকার করে। ইউনূস বলেন,
এই অঙ্গীকারই ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি হিসেবে
কাজ করবে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের জনগণ
এখন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের
স্বপ্নে এগিয়ে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক
দিক থেকেও এই সরকার একটি
বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মুখে দায়িত্ব নেয়
বলে জানান ইউনূস। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে
দেশে দুর্নীতি, অপচয় ও রাজনৈতিক
সুবিধা হাসিলের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদের
অপব্যবহার চরম আকার ধারণ
করেছিল। বিভিন্ন তথাকথিত মেগা প্রকল্প ছিল
মূলত জনসম্পদের লুণ্ঠনের উৎস। এসবের ফলে
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে তৈরি হয় নাজুকতা,
মুদ্রানীতি হয়ে পড়ে অকার্যকর
এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পড়ে যায় চরম
চাপে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায়
সরকার রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করে, ভর্তুকিনির্ভর মুদ্রানীতির
পরিবর্তে বাজারভিত্তিক বিনিময়হার চালু করে এবং
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরত
আনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তরুণ সমাজ
নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন প্রধান
উপদেষ্টা। তিনি বলেন, দেশের
তরুণরা কেবল চাকরিপ্রার্থী হয়ে
থাকবে না—তাদের গড়ে
তোলা হবে উদ্যোক্তা হিসেবে।
এজন্য সরকার শুধু প্রযুক্তিগত নয়,
সামাজিক উদ্ভাবনের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রযুক্তি যেন সমাজে ন্যায্যতার
ভিত্তিতে ব্যবহৃত হয়, সেই নিশ্চয়তা
দেওয়ার জন্য এখনই ব্যবস্থা
নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিশ্ব জলবায়ু সংকট নিয়ে হতাশা
প্রকাশ করে ইউনূস বলেন,
ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু বিপর্যয়ের
শিকার হচ্ছে, অথচ উন্নত দেশগুলো
তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ সহায়তা দিচ্ছে
না। “লস অ্যান্ড ড্যামেজ
ফান্ড” চালু না হওয়ায়
এবং অভিযোজন প্রকল্পে সহযোগিতার অভাবে বাংলাদেশসহ অনেক দেশ ভয়াবহ
ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে
সতর্ক করেন তিনি। রোহিঙ্গা
সংকট নিয়ে জাতিসংঘের মঞ্চে
দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইউনূস বলেন,
আট বছর ধরে বাংলাদেশ
বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু
আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাস পাওয়ায় বর্তমানে তাদের খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা
হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্ব
খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে যে, তহবিলের অভাবে
রোহিঙ্গাদের রেশন অর্ধেকে নামিয়ে
আনা হতে পারে। এই
অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা কেবল
মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং নিরাপত্তার
ঝুঁকিও সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, এই
সংকট শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার
দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়; এটি
একটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মানবাধিকার
সংকট। রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য তিনি রাখাইনে
পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক
প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানান। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে শিশু ও নিরীহ
মানুষের প্রাণহানিতে গভীর ক্ষোভ ও
উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইউনূস। তিনি
বলেন, আমাদের চোখের সামনে একটি নির্মম গণহত্যা
চলছে, অথচ বিশ্ব বিবেক
নীরব। তিনি জাতিসংঘ ও
বিশ্ব সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে অবিলম্বে
কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, “ফিলিস্তিন
সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা—এখনই এই দ্বিরাষ্ট্র
সমাধান বাস্তবায়নের সময়।”অঞ্চলিক সহযোগিতা
এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যত উন্নয়ন নিয়ে ইউনূস বলেন,
বাংলাদেশ বিমসটেক, বিবিআইএন, সাসেক-এর মতো উদ্যোগের
মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্য জোরদার
করছে। পাশাপাশি, আসিয়ান ও সার্ককে কার্যকর
করতে চায় বাংলাদেশ। তিনি
বলেন, “প্রতিবেশীদের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা ছাড়া
উন্নয়নের ভবিষ্যৎ টেকসই হয় না।”ভাষণের
শেষাংশে ইউনূস তার বহুল আলোচিত
“তিন শূন্য” দর্শনের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ পৃথিবী গড়ে উঠবে শূন্য
কার্বন নিঃসরণ, শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীভূতকরণ এবং শূন্য বেকারত্বের
ভিত্তিতে। তরুণ প্রজন্মই হবে
এই তিন শূন্য বাস্তবায়নের
সৈনিক। এই পৃথিবী হবে
শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে প্রযুক্তি
ও মানবিকতা একসঙ্গে বিকশিত হবে।
তিনি
বলেন, “আমার দেশের জনগণ
গত বছর প্রমাণ করেছে
যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের শক্তি সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা
প্রমাণ করেছে যে পরিবর্তন শুধু
সম্ভব