লাভলু সরকার| কালবিন্দু| রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
স্টাফ রিপোর্টার
আজ শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক আনুষ্ঠানিক আয়োজনে স্বাক্ষরিত হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সনদে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা ঘোষণা করেন।
বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিশিষ্ট নাগরিক, কূটনীতিক এবং পেশাজীবীরা। বিকেল ৫টায় অধ্যাপক ইউনূসসহ রাজনৈতিক নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে সনদে স্বাক্ষর করেন। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “এই সনদ নতুন বাংলাদেশের সূচনা চিহ্নিত করছে। আজ আমরা একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করলাম, যা ভবিষ্যতের জন্য গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সামাজিক সহমর্মিতার পথপ্রদর্শক হবে।”
স্বাক্ষরের আগের দিন ১৬ অক্টোবর ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দাবির মুখে জুলাই সনদের অঙ্গীকারনামার ৫ নম্বর দফায় গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, সংশোধিত দফায় ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুম, খুন, নির্যাতনের শিকারদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, আহতদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ এবং শহীদদের পরিবারকে আইনগত দায়মুক্তিসহ মৌলিক অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
জুলাই
সনদে স্বাক্ষর করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক
দলের নেতারা।
বিএনপির
পক্ষে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির
সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ
মোহাম্মদ তাহের ও সেক্রেটারি জেনারেল
মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী
সমন্বয়কারী আবুল হাসান, নাগরিক
ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, এবি পার্টির চেয়ারম্যান
মজিবুর রহমান মঞ্জু, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকনসহ বিভিন্ন
দলের নেতারা উপস্থিত থেকে সনদে স্বাক্ষর
করেন।
উপদেষ্টা পরিষদ থেকে ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদের আইনি ভিত্তির বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ায়। একইভাবে বাম ধারার চারটি দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী) এবং বাংলাদেশ জাসদ সংশোধিত খসড়া হাতে না পাওয়ার অজুহাতে সনদে স্বাক্ষর করেনি।
অনুষ্ঠানের
আগে দুপুর ১টার দিকে 'জুলাই
যোদ্ধা' পরিচয়ে একদল ব্যক্তি অনুষ্ঠানস্থলে
জড়ো হয়। তাদের ছত্রভঙ্গ
করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে
সংঘর্ষ বেঁধে যায়। ইটপাটকেল নিক্ষেপ,
লাঠিচার্জ এবং আগুন দেওয়ার
ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “এ
ধরনের সংঘর্ষ এই ঐতিহাসিক দিনের
জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও দুঃখজনক।”
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “এটি একটি ভালো সনদ। কিছু ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকলেও এগুলো দূর করে সবাইকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে।” আইনজীবী শিশির মনির জানান, জুলাই যোদ্ধাদের তিনটি দাবি ইতোমধ্যে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে এবং তাদের অভিযোগের ভিত্তিতেই সনদের ৫ নম্বর দফা সংশোধন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
সনদ স্বাক্ষরের পর অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “এটি কেবল একটি কাগজ নয় এটি লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধের শপথ। আমরা নতুন এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করলাম আজ।”
জুলাই
সনদ ২০২৫ একটি ঐতিহাসিক
দলিল হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে, যেখানে
অন্তর্বর্তী সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক
দলগুলো একসঙ্গে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও পুনর্গঠনের স্বপ্নে
একমত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়,
এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত ও
কার্যকরভাবে সম্ভব হয়।