প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:০২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৫ ১১:৪৪ এ এম
নিম্ন বেতন ও বঞ্চনায় বিপর্যস্ত দেশের শিক্ষক সমাজ।
নাজীর আহম্মেদ খান| কালবিন্দু| রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
নিম্ন বেতন, বঞ্চনা ও মর্যাদাহীনতায় বিপর্যস্ত দেশের শিক্ষক সমাজ
নিম্ন বেতন, পেনশন জটিলতা ও মর্যাদাহীনতায় ভুগছেন দেশের শিক্ষকরা। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন সবচেয়ে কম। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষকের মর্যাদা না বাড়ালে উন্নয়ন অসম্ভব।
দেশের শিক্ষকরা আজ কঠিন বাস্তবতার মুখে। নিম্ন বেতন, পদে পদে বঞ্চনা, পেনশন পেতে হয়রানি এবং সামাজিক মর্যাদার সংকটে জর্জরিত এই পেশাজীবীরা ক্লাসরুমের বদলে রাজপথে আন্দোলনে নামছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষকদের মান-মর্যাদা না বাড়িয়ে জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই শিক্ষকদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করতে পারেনি।
বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। একজন প্রাথমিক শিক্ষক মাসে গড়ে পান প্রায় ১৭০ ডলার (প্রায় ১৯ হাজার টাকা), যেখানে দেশের মাথাপিছু মাসিক আয় এর চেয়ে ৬২ ডলার বেশি।
অন্যদিকে মালদ্বীপের শিক্ষকরা পান প্রায় ৯৫৩ ডলার, ভারতের শিক্ষকরা গড়ে ২৮৪ ডলার, নেপালে ৪৬৭ ডলার এবং শ্রীলঙ্কায় ২৫০ ডলার। বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো তাই স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক।
প্রাথমিক শিক্ষকেরা বর্তমানে ১৩তম গ্রেডের কর্মচারী। তাদের মূল বেতন মাত্র ১১ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ১৯ হাজার টাকার মতো।
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দিন মাসুদ কালবিন্দুকে বলেন,
“শিক্ষকতা পৃথিবীর সর্বাধিক সম্মানজনক পেশাগুলোর একটি। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষকদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান বা বেতন কাঠামো এখনো ন্যায্য পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই শিক্ষকরা সমাজে প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত।”
মাধ্যমিক পর্যায়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা চাকরিতে যোগ দেন মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে। বাড়িভাড়া বাবদ মাসে পান মাত্র ৫০০ টাকা। অবসরে গিয়ে নিজের পেনশনের টাকা পেতে বছর বছর ঘুরতে হয়।
জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী কালবিন্দুকে বলেন,
“বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা আজও নিদারুণ কষ্টে দিন কাটান। রাজনৈতিক দলগুলো মুখে শিক্ষকদের সম্মান দেয়, কিন্তু বাস্তবে দেয় না। জাতীয়করণই এখন একমাত্র সমাধান।”
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষকদের অবস্থান ভালো নয়। অতিমাত্রায় রাজনীতি, গবেষণাবিমুখতা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন প্রাথমিক শিক্ষকদের চেয়েও কম।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ কালবিন্দুকে বলেন,
“স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। শিক্ষা এখন রাজনৈতিক ব্যর্থতার একটি ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা সংস্কারের জন্য একটি জাতীয় কমিশন গঠন জরুরি।”
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য— “শিক্ষকতা পেশা: মিলিত প্রচেষ্টার দীপ্তি।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের শিক্ষকদের জীবনমান এখনো সংকটে। ন্যায্য বেতন, সামাজিক মর্যাদা ও অবসরকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শিক্ষার মানও উন্নত হবে না। শিক্ষকদের বঞ্চনা যতদিন থাকবে, জাতির অগ্রগতি ততদিন থমকে থাকবে।
Copyright © 2026 All Rights Reserved | Siyam Creations |