MD ANIS | Times News 24 | Fast Online News Portal | মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এ এম
বিশ্ব রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে এক ঐতিহাসিক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চীনের বিশাল বাজারে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ইউএস ডলারের পণ্য রপ্তানির অনন্য মাইলফলকের একদম দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার সমান্তরালেই দুই দেশের মধ্যে বিরাজ করছে ১৭ বিলিয়ন ডলারের এক আকাশচুম্বী ও বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি।
বর্তমান এই অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরকে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা কাটিয়ে ওঠা এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের সবচেয়ে বড় ও যুগান্তকারী কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।
রেকর্ড রপ্তানি ও ১৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ব্যবধান:
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা মোট ৭৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছেন—যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। অর্থবছরের বাকি এক মাসের হিসাব যোগ হলে এটি ১ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করবে।
তবে বিপরীতে আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান এখনো বিশাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেন ভারসাম্য সারণি অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই (জুলাই-এপ্রিল) চীন থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ১ হাজার ৮০০ কোটি (১৮ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য। এর বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৬৭ কোটি ২৬ লাখ ডলার। ফলে ১০ মাসেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৩২ কোটি ৭৪ লাখ (১৭.৩২ বিলিয়ন) ডলারে, যা দেশের সামগ্রিক মোট বাণিজ্য ঘাটতির (২২.২১ বিলিয়ন ডলার) ৭৫ শতাংশেরও বেশি।
সূচকসময়কালপরিমাণ (ইউএস ডলারে)চীনে বাংলাদেশের রপ্তানিজুলাই-এপ্রিল (১০ মাস)৬৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারচীন থেকে বাংলাদেশের আমদানিজুলাই-এপ্রিল (১০ মাস)১,৮০০ কোটি (১৮ বিলিয়ন) ডলারদ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতিজুলাই-এপ্রিল (১০ মাস)১,৭৩২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)
চীনের সঙ্গে এই বিশাল ঘাটতিকে ঢালাওভাবে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদত হোসাইন বলেন, "এখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তত্ত্বের তুলনামূলক সুবিধা (Comparative Advantage) বুঝতে হবে। আমাদের দেশে নিজস্ব কাঁচামাল বা র-মেটেরিয়ালস নেই, তাই চীন থেকে সুলভে তা আমদানি করে অন্য দেশে তৈরি পণ্য রপ্তানি করাই আমাদের জন্য লাভজনক। আমাদের বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) দরকার। এফডিআই ও চীনা উন্নত টেকনোলজি ছাড়া আমাদের পক্ষে উৎপাদন খরচ (Per Unit Cost) কমানো সম্ভব নয়।"
তৈরি পোশাক খাতের কৌশল নিয়ে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (BCCCI) সাবেক সাধারণ সম্পাদক আল মামুন মৃধা জানান, চীন বিশ্ববাজার থেকে বছরে ১২-১৩ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করে। তবে সেই বাজার ধরার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো চীনের কাছ থেকে পাওয়া আধুনিক টেকনোলজি, মেশিনারিজ ও এক্সেসরিজের সুবিধা অব্যাহত রাখা। এই ব্যাকআপ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে পোশাক রপ্তানি আরও বাড়াতে পারবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার কমে যাওয়াকে তিনি একটি বড় ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলার পাশাপাশি 'চাইনিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল'-সহ বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের কাজ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে আছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে আল মামুন মৃধা কিছু জরুরি সংস্কারের তাগিদ দিয়ে বলেন, "চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চান। বিশেষ করে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান, কর কাঠামো সহজীকরণ, ব্যাংকিং খাতের ২৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ ও এলসি সেটেলমেন্টের বিরোধ দ্রুত সমাধান করা জরুরি।"
সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি এখন প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের দিকে। তারা মনে করছেন, এই সফরের মাধ্যমে আটকে থাকা প্রকল্পগুলোর দ্রুত অর্থায়ন, এফটিএর অগ্রগতি এবং শুল্কমুক্ত সুবিধার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি হবে, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।