ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বহুল আলোচিত নতুন ‘মাইগ্রেশন ও অ্যাসাইলাম প্যাক্ট’ (Migration and Asylum Pact) কার্যকর হওয়ার পর ফ্রান্সসহ পুরো ইউরোপজুড়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আশ্রয় প্রক্রিয়ায় এসেছে এক আমূল পরিবর্তন। এই নতুন ও কঠোর ব্যবস্থার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আধুনিকায়িত ‘ইউরোড্যাক’ (Eurodac) ডেটাবেস। আর এই আধুনিক ডিজিটাল সিস্টেম নিয়ে এখন ইউরোপের নীতিনির্ধারক ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, এই প্রযুক্তি কি আসলেই সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি অসহায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য তৈরি করবে রাষ্ট্রীয় নজরদারির নতুন এক বন্দিশালা বা ফাঁদ?
ছয় বছরের শিশুর বায়োমেট্রিক ও কঠোর ডিজিটাল নজরদারি: ইউরোড্যাক ডেটাবেসের নতুন হালনাগাদের ফলে এখন থেকে ইউরোপে প্রবেশকারী অভিবাসীদের কেবল হাতের আঙুলের ছাপই নয়, বরং মুখমণ্ডলের নিখুঁত বায়োমেট্রিক তথ্য বা ছবিও (Facial Recognition) বাধ্যতামূলকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হবে। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে বয়সসীমা নিয়ে; নতুন নিয়মে এই ডেটাবেসের আওতায় আনা হয়েছে মাত্র ছয় বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদেরও, যেখানে আগে এই বয়সসীমা ছিল ন্যূনতম ১৪ বছর। ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনিয়মিত বা অবৈধ অভিবাসন রোধের প্রধান হাতিয়ার হিসেবেই দেখছে। ইইউ স্পষ্ট করে বলছে, একজন ব্যক্তি যেন ইউরোপের এক দেশে আশ্রয়ের আবেদন বাতিল বা নাকচ হওয়ার পর অন্য দেশে গিয়ে পুনরায় নতুন নামে আবেদন করার সুযোগ না পান। অর্থাৎ, তথাকথিত ‘সেকেন্ডারি মুভমেন্ট’ বা ‘অ্যাসাইলাম শপিং’ পুরোপুরি চিরতরে বন্ধ করতেই এই কঠোর ডিজিটাল পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ফাস্ট-ট্র্যাক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকারের সংকট: এই কঠোর ডিজিটাল নজরদারি ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থনাকারী সাধারণ মানুষদের জন্য এক নতুন মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নতুন আইন অনুযায়ী, সীমান্তে প্রবেশের পর মাত্র সাত দিনের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যাচাই ও নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ করতে হবে। এরপর ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ নামের দ্রুততম প্রক্রিয়ায় যাদের আবেদন সামান্যতম ভিত্তিহীন বা সন্দেহজনক মনে হবে, তাদের আইনি আপিলের সুযোগ না দিয়ে দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ইউরোড্যাকের মতো এই শক্তিশালী গ্লোবাল ডেটাবেস আশ্রয়প্রার্থীদের কার্যত এক ‘ডিজিটাল খাঁচায়’ বন্দি করে ফেলছে। কাগজের কোনো সামান্য ভুল বা তথ্যের অমিলের কারণে মুহূর্তেই হয়তো কোনো প্রকৃত ভুক্তভোগীর আশ্রয়ের অধিকার চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন
বিশ্ববাজারে একলাফে বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সে এই আইনের প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্থল সীমান্তগুলোতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কড়াকড়ি ও তল্লাশি করা হচ্ছে। যদিও নতুন নিয়মে একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে—আশ্রয়প্রার্থীরা ফ্রান্সে প্রবেশের ছয় মাস পর থেকেই সরাসরি বৈধভাবে শ্রমবাজারে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা আগের নয় মাসের নিয়মের তুলনায় কিছুটা স্বস্তির। তবুও সামগ্রিকভাবে এই প্রক্রিয়ার আমূল কঠোরতা ও যান্ত্রিকতা আশ্রয়ের মূল মানবিক ও আন্তর্জাতিক ধারণাকেই বড় ধরণের প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নতুন বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, সুরক্ষা নিশ্চিত করার নামে আসলে ইউরোপের মাটি থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের তাড়িয়ে দেওয়ার আয়োজন চলছে, যা আশ্রয়প্রার্থীদের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।