দেশের যুব সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী সর্বস্তরে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উদ্ভাবনী মেধার প্রতিযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, শুধু বলপ্রয়োগ বা চিকিৎসার মাধ্যমে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়; এর জন্য তরুণদের বিপুল শক্তিকে ইতিবাচক খাতে ব্যবহারের বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মাদক সমস্যার বিকল্প সমাধান ও মাঠের সংকট: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, "আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে এখন অন্যতম প্রধান এবং বড় সমস্যা হচ্ছে মাদক। বিশ্বব্যাপী এই সমস্যা কম-বেশি থাকলেও আমাদের দেশে এর প্রকোপ ও বিস্তার আশঙ্কাজনক। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে কতজনকে ধরব, কতজনকে চিকিৎসা দেব বা কাউন্সেলিং করব? আমাদের তো সক্ষমতা, লোকবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই এই সামাজিক ব্যাধির চূড়ান্ত সমাধানে আমাদের বিকল্প ও স্থায়ী পথ খুঁজতে হবে।"
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ-সবল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের শারীরিক ও মানসিক যে বিপুল শক্তি থাকে, তা যদি সঠিক পথে চালিত না হয়, তবে তারা বিপথগামী হবে। এই শক্তি ইতিবাচক খাতে ব্যবহারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো খেলাধুলা ও সংস্কৃতির নিয়মিত চর্চা। অথচ অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, ঢাকা শহরসহ সারাদেশেই এখন খেলার মাঠের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
‘নতুন কুঁড়ি’ ও প্রচারমাধ্যমে অবহেলা: তরুণদের এই শক্তিকে দেশ গঠনে কাজে লাগাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমরা এরই মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে ‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা নতুন উদ্যোমে চালু করেছি। সম্প্রতি শেষ হওয়া একটি শিক্ষা বিভাগীয় ইভেন্টে সারাদেশের প্রায় ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব পরিবারের সন্তানরা এখানে যুক্ত হয়েছে। অথচ অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এত বড় এবং ইতিবাচক একটি জাতীয় আয়োজন আমাদের দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে সেভাবে কোনো গুরুত্বই পায়নি।"
কেবল খেলাধুলা নয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দেশের তরুণদের মেধা বিকাশের জন্য জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়মিত উদ্ভাবনী মেলা বা সায়েন্স ফেয়ার আয়োজনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, "বছরের নির্দিষ্ট কিছু জাতীয় দিন (যেমন ১৬ ডিসেম্বর বা ২১ শে ফেব্রুয়ারি) ছাড়া কেন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সারা বছর নিয়মিত সাংস্কৃতিক বা বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয় না? যুব সমাজকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে এই ইতিবাচক চর্চাগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরজুড়ে চালু রাখতে হবে।"
নৈতিক অবক্ষয় ও অস্বাভাবিক মানসিকতা রোধ: সমাজে তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার ওপর তীব্র তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "আজকাল সমাজে অদ্ভুত ও বীভৎস মানসিকতা দেখা যায়। একটা জীবন্ত প্রাণীকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে আর চারপাশে থাকা ১০ জন মানুষ তা হাত গুটিয়ে মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করছে! এগুলো সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক মানসিকতার লক্ষণ। স্কুল পর্যায় থেকেই আমাদের সন্তানদের মাঝে সামাজিক, মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পারিবারিক চর্চা বাড়াতে হবে।" তিনি জানান, মানুষের মাঝে নৈতিক চেতনা জাগ্রত করতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে দেশব্যাপী বড় পরিসরে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন বা প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উক্ত মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কার, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং সরকারের প্রস্তাবিত জনকল্যাণমুখী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার্স কার্ড’ এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবীণ সাংবাদিকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দেন। সভায় তথ্যমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং দেশের জাতীয় গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।