ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও চূড়ান্ত ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মহাবিস্ফোরণ ঘটে গেছে। নিজেদের দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) থেকে চিরতরে অপসারণ করা হয়েছে দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। দলটির প্রকাশ্য নিয়ন্ত্রণ ও ‘দখল’ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে শক্তিশালী এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
ইতিমধ্যেই মমতা-অভিষেককে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে তৃণমূলের একটি নতুন সমান্তরাল জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। নতুন এই শক্তিশালী কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন হাওড়া মধ্য বিধানসভা কেন্দ্রের প্রভাবশালী বিধায়ক অরূপ রায়।
নিউ টাউনের বিলাসবহুল হোটেলে গোপন বৈঠক: সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সূত্র জানায়, গত সোমবার (২২ জুন) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় গুরুত্বপূর্ণ বাজেট অধিবেশন ছিল। সেই অধিবেশন শেষ হওয়ার পরপরই তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়করা কলকাতার নিউ টাউনের একটি বিলাসবহুল হোটেলে হাইপ্রোফাইল বৈঠকে বসেন। অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এই বৈঠকে তৃণমূলের সরাসরি ৬০ জন বর্তমান বিধায়ক এবং কলকাতার প্রায় ৭০ জন প্রভাবশালী সাবেক কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন। দলীয় এই মেগা বৈঠকেই সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তৃণমূলের নতুন ৩০ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
দলীয় সংবিধানের ফাঁদে কুপোকাত মমতা-অভিষেক
আরও পড়ুন
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা বিধ্বংসী বিমান হামলা
বিদ্রোহীদের এই বিশেষ বৈঠকে তৃণমূলের মূল দলীয় সংবিধানের ২০ নম্বর ধারার আইনি বাধ্যবাধকতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সাংবিধানিক ধারা অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর দলের ‘জাতীয় কর্মসমিতি’র (National Working Committee) বৈঠক ডাকার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বিগত ২০২২ সালের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের কোনো জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
এই চরম সাংবিধানিক লঙ্ঘনকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন বিদ্রোহীরা। বৈঠকে সর্বসম্মত প্রস্তাব এনে ভেঙে দেওয়া হয়েছে আগের বিতর্কিত জাতীয় কর্মসমিতি এবং সে কারণেই নতুন জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি বিদ্রোহীদের।
তৃণমূলের এই নতুন কমিটির সহ-সভাপতি করা হয়েছে রাজ্যের সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে। এ ছাড়াও তৃণমূলের আরও দুই হেভিওয়েট বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম ও রথীন ঘোষকে সহ-সভাপতি পদে বসানো হয়েছে। নতুন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়াও বেছে নেওয়া হয়েছে জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা ও সাবিনা ইয়াসমিনকে। নতুন কমিটির প্রধান কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে।
ব্যানারে নেই মমতা, কালীঘাট থেকে পাল্টা শোকজ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে বিদ্রোহীদের বৈঠকের মূল মঞ্চের ব্যানারটি। বহুল আলোচিত সেই ব্যানারে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো ছবি বা নাম ছিল না। তবে সেখানে মহাত্মা গান্ধী, বি আর আম্বেদকর, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবি শোভা পাচ্ছিল।
এদিকে নিউ টাউনের এই বিদ্রোহী বৈঠক শেষ হওয়ার পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে কালীঘাটে অবস্থিত মমতার অনুগত মূল তৃণমূল শিবির। দলবিরোধী মারাত্মক কার্যকলাপ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান, অরূপ রায়, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ, সাবিনা ইয়াসমিন, স্নেহাশিস চক্রবর্তী এবং বিপ্লব মিত্রসহ শীর্ষ বিদ্রোহী নেতাদের বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) জারি করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূলের ভাঙন এবং ওপার বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ এখন সম্পূর্ণ অনিবার্য।





.jpg)












আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।