দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান ও কাঠামো আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৮ সাল থেকে দেশের কোনো প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সুনির্দিষ্ট পেশাগত প্রশিক্ষণবিহীন কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই নিয়ম কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য নয়—দেশের সব কিন্ডারগার্টেন, প্রাইভেট বাংলা মিডিয়াম ও ইংলিশ মিডিয়ামসহ সব ধরনের বেসরকারি স্কুলের জন্যও সমভাবে বাধ্যতামূলক করা হবে।
গত সোমবার (২২ জুন) ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) স্কুল অব ফার্মেসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথ এবং বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক (বিইএন) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব যুগান্তকারী ঘোষণা দেন।
প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জানান, আগামী ২০২৮ সালে সম্পূর্ণ নতুন প্রাথমিক কারিকুলাম দেশব্যাপী চালু করা হবে, যার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই প্রাক-প্রাথমিক কারিকুলাম সংশোধনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা চাই না কোনো অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করুক। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণের কাজ চলছে। বড় ভবনের চেয়ে দক্ষ শিক্ষক ও মনোযোগী শিক্ষার্থী বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সংস্কৃতিতে শ্রেণিকক্ষে জোর করে পড়ানোর যে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে শিশুদের জন্য আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।"
শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের স্বার্থে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ আধুনিকায়নের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সাথে এখন থেকে নতুন যেকোনো বেসরকারি বা কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানের খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক করার আইনি কাজ চলছে। এ ছাড়া দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে পর্যায়ক্রমে ‘ওয়ান শিফট’ স্কুলে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার বৃহৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, "আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী গ্র্যাজুয়েটরা প্রাথমিক শিক্ষকতাকে সম্মানজনক ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিক। এ লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষকতায় একটি সুস্পষ্ট ও আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার পাথ (Career Path) তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকার বিশেষ মেগা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ইউএইচটি (UHT) প্যাকেটজাত দুধ সরবরাহ করা হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশে এ ধরনের দুধের উৎপাদন ও সরবরাহ চার গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে দেশব্যাপী পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উক্ত সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম, ন্যাশনাল একাডেমি ফর প্রাইমারি এডুকেশনের (NAPE) মহাপরিচালক ফরিদ আহমেদ, আইইউবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান দিদার এ হোসেইন এবং স্কুল অব ফার্মেসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথের ডিন ড. কামরান উল বাসেতসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশি-বিদেশি অংশীজনরা।
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।