কিচেন ক্যাবিনেট’—শব্দটির উৎপত্তি প্রায় দুই শতাব্দী আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হলেও, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি এখন সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অভ্যন্তরে একটি অনির্বাচিত ‘ছায়া সরকার’ বা ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করত বলে সাবেক একাধিক উপদেষ্টার বিস্ফোরক মন্তব্যে তীব্র সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত ও উপদেষ্টাদের স্বীকারোক্তি: এই রাজনৈতিক বিতর্কের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। গত ২৫ মে এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, একটি গোপন ও অনির্বাচিত সাত সদস্যের 'কিচেন ক্যাবিনেট' বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের মূল উপদেষ্টা পরিষদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ও কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনানুষ্ঠানিক কিচেন ক্যাবিনেট প্রতি মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গোপন বৈঠকে বসত এবং সেখান থেকেই রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতো। তৌহিদ হোসেনের পর সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন এবং খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারও স্বীকার করেন যে, ড. ইউনূসের সরকারের ভেতরে আরেকটি প্রভাবশালী ছোট বলয় সক্রিয় ছিল, যারা মূলত দেশ চালাত।
কারা ছিলেন এই কিচেন ক্যাবিনেটে? খাতসংশ্লিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উপদেষ্টা পরিষদের সুনির্দিষ্ট সাক্ষাৎকার ও গতিবিধি বিশ্লেষণ করলে এই কোর কমিটিতে কারা ছিলেন তা অনুমান করা কঠিন নয়। ড. ইউনূসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ড. আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান এবং সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এই নীতিনির্ধারক গণ্ডির মূল কারিগর ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। যদিও আসিফ নজরুল এই দাবি অস্বীকার করেছেন, তবে জনমনে তাঁর সাম্প্রতিক নানা বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক সংশয় ও অনাস্থা রয়েছে। বিগত দেড় বছর ধরে যারা ইউনূস সরকারের সব সিদ্ধান্তের সার্বক্ষণিক অংশীদার ও ছায়াসঙ্গী ছিলেন, তারাই এই কিচেন ক্যাবিনেটের মাধ্যমে দেশের ভাগ্যবিধাতা বনে গিয়েছিলেন।
সাংবিধানিক ও আইনি বৈধতার প্রশ্ন: বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বা উন্নত গণতন্ত্রে (যেমন ট্রাম্পের কোর টিম বা কিয়ার স্টারমারের বিশ্বস্ত গ্রুপ) কিচেন ক্যাবিনেটের অস্তিত্ব থাকলেও, তারা মূলত রাষ্ট্রপ্রধানকে কেবল পরামর্শ বা প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবগুলো পরবর্তীতে মন্ত্রিসভায় বা সাংবিধানিকভাবে বৈধ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্ল্যাটফর্মে এসে গণতান্ত্রিক নিয়মে চূড়ান্ত হয়।
কিন্তু ড. ইউনূসের সরকারের ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে যে, তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক মন্ত্রিসভাকে অন্ধকারে রেখে সরাসরি কিচেন ক্যাবিনেটের মাধ্যমেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ইজারার মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত এককভাবে বাস্তবায়ন করেছেন। সাংবিধানিকভাবে গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এভাবে অকার্যকর করে রেখে পর্দার আড়াল থেকে দেশ পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক, বেআইনি এবং অনৈতিক। জনগণের মতামত কিংবা সম্পূর্ণ উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ দায়বদ্ধতাকে তোয়াক্কা না করে এভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাকে এক ধরণের রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে দেখছেন আইনবিদরা।
সমালোচকদের মতে, ইউনূস সরকারের যেসব উপদেষ্টা নিজেদের ‘অলংকার’ হিসেবে রেখে সরকারি তহবিল থেকে বিপুল বেতন-ভাতা এবং গাড়ি-বাড়ির সুবিধা ভোগ করেছেন, কাজ করতে না পারার দায়ে তাদের সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া উচিত। একই সাথে, নির্বাচিত বর্তমান সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কীভাবে এবং কাদের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছিল, তার একটি নিরপেক্ষ আইনি মূল্যায়ন বা অডিট করা। অন্যথায়, ভবিষ্যতে বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে বড় ধরনের জটিল সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।