লেখক: ভিনসেন্ট হালদার (মোংলা, বাগেরহাট)
১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভেনিস শহরের অদূরে ভিল্লাভেরলা গ্রামে জন্ম মারিনো রিগনের। একজন মিশনারি হিসেবে ১৯৫৩ সালে বাংলাদেশে আসেন। কিছুদিন যশোরে কাজ করার পর আসেন সুন্দরবনঘেঁষা জনপদ বাগেরহাটের মোংলায়। মোংলা তখন বিচ্ছিন্নপ্রায় এক জনপদ।পানিপথই ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এমন এক পরিবেশে গিয়ে কাজ শুরু করেন ফাঃ মারিনো রিগন। শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ফাদার। মোংলায় ১৭ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তিনি। তিনি ছিলেন মোংলা উপজেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সেন্ট পলস্ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। ফাঃ ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন স্বনামধন্য এ বিদ্যালয়টি। স্পন্সর শীপের মাধ্যমে মোংলায় শিক্ষার বাতি জ্বালিয়েছেন ভিনদেশী ধর্মযাজক।
শিক্ষার পরে স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়েছেন ফাদার মারিনো রিগন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে আহত যোদ্ধাদের সেবা যত্ন করে সারিয়ে তুলেছেন ফাদার। শত-সহস্র দুস্থ ও পীড়িত মানুষের সেবায় এগিয়ে এসেছেন মারিনো রিগন। অগণিত টাকা দান করে শয্যাশায়ী ও মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকে সারিয়ে তুলেছেন ফাঃ। চিকিৎসা ও নিরাময়ের জন্য শেলাবুনিয়াতে প্রতিষ্ঠা করেছেন সেন্ট পলস্ হাসপাতাল।
বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় ফাদারের কোন কমতি ছিলনা। গান, নাচ ও সাহিত্য চর্চা ছিল বেশ শখের। বিশ্বকবির গীতাঞ্জলি, পল্লীকবির নক্সীকাথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ ও কিছু কবিতা ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেন ফাদার রিগন। এ ছাড়া লালনের গানসহ এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের বেশ কিছু কবিতা অনুবাদ করেন তিনি। কিছু বই তিনি ইতালিতে অনুবাদ করেছেন। কবিগুরু ও বাউল সম্রাট সম্পর্কে তিনি বলতেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমার মস্তিষ্কে, আর লালনের বাস আমার অন্তরে।’
ফাঃ মারিনো রিগন গরীব, দুস্থ, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের পাশে থেকেছেন সর্বদা। শিক্ষা, চিকিৎসা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বাসস্থান ইত্যাদি খাতে দান করেছেন কোটি কোটি টাকা।
আরও পড়ুন
শাস্তির নৈতিক ভিত্তি: ফাঁসির মাধ্যমে সমাজকে দেওয়া বার্তা
বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধু হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন ফাঃ মারিনো রিগন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় ফাদার রিগনকে। মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য ২০১২ সালে তাঁকে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।
অগণিত মানুষকে ভালোবাসেছেন ফাঃ আর তাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন মারিনো রিগন।
তাই তো ফাদারের শেষ ইচ্ছা ছিল এই বাংলায় শায়িত হবেন তিনি। কবি জীবন আনন্দের আবার আসিব ফিরে কবিতাটি হুবহু নকল করেছেন ফাঃ।
২০১৪ সালে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় জর্জর রিগন। বাংলাদেশে এসে তাঁকে ইতালিতে নিয়ে যান বোন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ফাঃ মারিনো রিগন । শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে সমাহিত করা হয়। তিনি এই বাংলায়ই রয়ে গেলেন।
ফাঃ মারিনো রিগনের ৮ম প্রয়ান দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই ও গভীরভাবে স্মরণ করছি ফাদারকে। একজন ভিনদেশী ধর্মযাজক যে অবদান রেখেছেন এ বাংলা তথা মোংলার মানুষের জন্য তা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এ অঞ্চলের মানুষ চিরদিন-চিরকাল।
ছবি : সংগৃহীত












আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।