নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা | ২১ অক্টোবর ২০২৫
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় আবারও যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন বেসামরিক ফিলিস্তিনি। আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা অবস্থায় এ ধরনের আগ্রাসন নতুন করে উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।
আবারও বোমাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণ
ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলের আল-শাআফ এলাকায় পৃথক দুটি হামলার ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজেদের বাড়িঘর দেখতে ফিরেছিলেন। এ সময় ইসরায়েলি বাহিনী তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, নিহত ব্যক্তিরা “হলুদ সীমারেখা” অতিক্রম করে শুজাইয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং তাদের অস্তিত্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছিল।
আরও পড়ুন
গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলি হামলা, একই পরিবারের ১১ জন নিহত
এই “হলুদ রেখা” হচ্ছে একটি সাময়িক সীমারেখা, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার আওতায় ৪ অক্টোবর প্রকাশিত মানচিত্রে নির্ধারণ করা হয়। যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনী ওই রেখার পেছনে অবস্থান করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তুফাহ এলাকার বাসিন্দা সামির বলেন, “পুরো এলাকা ধ্বংস হয়ে গেছে। মানচিত্রে রেখা দেখানো হলেও বুঝতে পারছি না, আসল সীমা কোথায়।”
যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ৯৭ নিহত
১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তার পর থেকে একাধিকবার ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় হামলা চালিয়েছে। গাজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
শুধু গত রোববারই ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৪২ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
ইসরায়েলের দাবি, রাফা এলাকায় হামাসের হামলায় তাদের দুই সেনা নিহত হওয়ায় তারা পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হামলা চালিয়েছে। তবে হামাস এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, “রাফার ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আমাদের কোনো ইউনিট সক্রিয় নেই। এ ঘটনার দায় আমাদের নয়।”
হামাসের এক মুখপাত্র অভিযোগ করেন, “ইসরায়েল আবারও যুদ্ধ শুরু করার অজুহাত খুঁজছে।”
হামাসের অবস্থান ও জিম্মি ইস্যু
হামাস জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ২০ জন জীবিত ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে এবং মৃতদের দেহ হস্তান্তরের উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে গাজায় চলমান হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
ইতোমধ্যেই গাজা থেকে মানবিক সহায়তা সরবরাহ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। রোববার ইসরায়েল সাহায্য পাঠানো বন্ধের হুমকি দিলেও পরে আবার জানায়, তারা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, সহায়তা আবার পাঠানো শুরু হলেও এর পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
‘শান্তি’র মুখোশে সহিংসতা?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পার্লামেন্ট নেসেটে জানান, এক দিনে গাজায় ১৫৩ টন বোমা নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তিনি বলেন, “আমাদের এক হাতে অস্ত্র, অন্য হাতে শান্তি। দুর্বলদের সঙ্গে নয়, শক্তিশালীদের সঙ্গে শান্তি হয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য ও বাস্তব হামলা পরিস্থিতি যুদ্ধবিরতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
৮০ বার যুদ্ধবিরতির ঘোষণার বাস্তবতা
গাজায় চলমান দ্বন্দ্বে গত দুই বছরে অন্তত ৮০ বার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছে—আন্তর্জাতিক চাপ, মানবিক সংকট কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার নামে। কিন্তু প্রতিবারই সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে ইসরায়েল, অভিযোগ ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থার।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার জেরে ইসরায়েল গাজায় টানা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ওই হামলায় ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, ১,১০০ জন নিহত হন এবং প্রায় আড়াই শতাধিক মানুষ জিম্মি হন।
তার জবাবে গাজায় নির্বিচার বিমান ও স্থল হামলা শুরু করে ইসরায়েল। দুই বছরের মধ্যে এ পর্যন্ত গাজায় ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা
















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।