সিরাজগঞ্জ, বাংলাদেশ দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আবহ যখন ঘনিয়ে এসেছে, তখন সিরাজগঞ্জে বিরল এক নির্বাচনি লড়াইয়ের আভাস স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাক্ষী থাকা এই জেলায় এবার ভোটের মাঠে দৃশ্যত অনুপস্থিত আওয়ামী লীগ। তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। আর সেই ফাঁকেই লড়াই জমে উঠেছে বিএনপি ও তাদের একসময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি নির্বাচনের আগেই দেশে ফিরবেন এবং নির্বাচনে অংশ নেবেন। এতে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ ও আশাবাদের জোয়ার বইছে। তার নেতৃত্বে প্রার্থী বাছাই, মাঠপর্যায়ের বৈঠক এবং প্রচারণায় গতি এসেছে।
মাঠে বিএনপির উঠান বৈঠক
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার ঝিকিরা মধ্যপাড়া গ্রামে সোমবার দেখা গেলো বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের ব্যস্ততা। একটি ছোট মাঠে আয়োজিত উঠান বৈঠকে অংশ নেন প্রায় ৫০ জন। বৈঠকে দলের একত্রিশ দফা কর্মসূচি তুলে ধরা হয় এবং ভোটারদের ধানের শীষের পক্ষে উৎসাহিত করা হয়। তবে এখানকার আসনে এখনো দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। পৌর বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমাদের এখানে পাঁচ-ছয়জন সম্ভাব্য প্রার্থী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে সবাই ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে কাজ করছেন।”
পাল্টা মাঠে জামায়াতের নৌকাবাইচ
একই দিনে উল্লাপাড়ার করতোয়া নদীর পাড়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী কর্মসূচি পালন করে জামায়াতে ইসলামি নৌকাবাইচ। নদীর তীরে বানানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় নেতা রফিকুল ইসলাম খান ও উপজেলা আমীর শাহজাহান আলী দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রচার চালান। স্লোগান ছিল দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন। শাহজাহান আলী জানান, তারা প্রায় এক বছর আগে থেকেই ঘরে ঘরে প্রচার চালাচ্ছেন এবং ভোটারদের সঙ্গে নানাভাবে সংযুক্ত রয়েছেন। এমনকি নির্বাচনি এজেন্ট নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের কাজও প্রায় শেষ।
আরও পড়ুন
বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণের জন্য চূড়ান্ত কৌশলগত রূপরেখা অনুসরণ করছে…
বিএনপি বনাম জামায়াত: কে কার চ্যালেঞ্জ?
উল্লাপাড়ায় জামায়াত আগে কখনও সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়নি। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দুই দলের মধ্যে সরাসরি লড়াইয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। জামায়াত নেতারা মনে করছেন, তাদের আগাম প্রস্তুতি, নির্ধারিত প্রার্থী, সাংগঠনিক কর্মসূচি এবং তৃণমূল সমর্থনের কারণে তারা এবার জয়ের অবস্থানে আছে। উপজেলা আমীর শাহজাহান বলেন, “শুধু জয় নয়, ইনশাআল্লাহ দুই-তৃতীয়াংশ আসন আমরা জিতবো।” অন্যদিকে বিএনপি মনে করে, জামায়াত কখনোই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নয়। রাজ্জাক বলেন, “উল্লাপাড়া বিএনপির ঘাঁটি। জামায়াত এখানে আমাদের ভোট কাটতে পারবে না।” তিনি উল্লেখ করেন, দলে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলেও তারা সবাই মূল প্রতীক ধানের শীষের জন্যই কাজ করছেন। তাছাড়া বিএনপি ভেতরে কোনো বড় ধরনের কোন্দল নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
সাধারণ ভোটারের ভাবনা
সোনতলা ব্রিজের পাশে কথা হয় কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে। মুদি দোকানদার জামান মিয়া বলেন, “আওয়ামী লীগ নাই, তবে বিএনপি আর জামায়াত টক্কর হবে।” আব্দুল হাকিম নামে আরেকজন জানান, দুই দলের লোকই ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এ থেকেই স্পষ্ট, সাধারণ ভোটাররাও জানেন এবারের নির্বাচন ‘ভিন্নধর্মী’ এবং ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে রাজনীতির পরবর্তী গতি।
আওয়ামী লীগের ভোট কোথায় যাবে?
সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনেই বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই জয়ের আশা করছে। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা। তারা কি ভোট দিতে যাবেন? গেলে কাকে দেবেন? জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অমর কৃষ্ণ দাস মনে করেন, “গণতন্ত্রের প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগের ভোটাররা এবার বিএনপিকে সমর্থন করবেন।” তার মতে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে জামায়াত মনে করে, নিরাপত্তা এবং জনসম্পৃক্ততার দিক থেকে তারাই এগিয়ে। উপজেলা আমীর বলেন, “আওয়ামী লীগের অনেক সাধারণ সমর্থক পাঁচই আগস্টের পর হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়েছেন। তবে সেটা জামায়াত করেনি। ফলে তারাই আমাদের ভোট দেবেন।”
জামায়াতের বিকল্প জোট গঠনের চেষ্টা
জামায়াত শুধু সিরাজগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেই আগাম প্রচারণা চালাচ্ছে এবং একটি বিএনপি-বিরোধী জোট তৈরির চেষ্টাও করছে। জরিপে দলটির অবস্থান বিএনপির কাছাকাছি উঠে আসায় আত্মবিশ্বাসে ভরপুর নেতাকর্মীরা।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জবাব: প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক
বিবিসি বাংলার সঙ্গে সাক্ষাতকারে বিএনপি নেতা তারেক রহমান বলেন, জামায়াত নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। “প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। বিএনপি সব সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন করেছে,” বলেন তিনি। আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তার মন্তব্য ছিল স্পষ্ট “যারা গুম-খুন-লুটপাট করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত। সেটা ব্যক্তি হোক বা দল।” তিনি মনে করেন, জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কে থাকবে, কে থাকবে না। “যদি কেউ মানুষের সমর্থন না পায়, তাদের টিকে থাকার কোনো কারণ নেই,” বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ।
সব মিলিয়ে সিরাজগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় সামনে এক ভিন্নধর্মী নির্বাচন অপেক্ষা করছে। বিএনপির প্রধান নেতা দেশে ফিরতে প্রস্তুত, জামায়াত মাঠে সক্রিয়, আওয়ামী লীগ নিষ্ক্রিয় এই সমীকরণে ভোটের লড়াই হবে ব্যতিক্রমী। কে কার ঘাঁটি ধরে রাখতে পারবে, কে পাবে অনুপস্থিত ভোটারদের সমর্থন এই প্রশ্নের উত্তর দেবে আগামীর নির্বাচন। তবে এ মুহূর্তে একথা নিশ্চিত করে বলা যায় নির্বাচনের আগেই মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ চূড়ায় পৌঁছাতে শুরু করেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।