সংবাদ প্রতিবেদন (কালবিন্দু):
গত বছরের সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা এবং একজনকে খুনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ১৬ আসামির বিরুদ্ধে আজ (মঙ্গলবার) ১২তম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এই মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ এ। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল আজ এ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান, এ মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আজ ১২তম সাক্ষী হিসেবে হাজির হচ্ছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী, যিনি ১৯৭১ সালের সেই হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা দেবেন।
মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৪ আগস্ট আশুলিয়ায় এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় এবং পরদিন ৫ আগস্ট ছয়জনকে ধরে এনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে তদন্ত সংস্থা।
আরও পড়ুন
কার্নিশে ঝুলে থাকা আমিরকে গুলিসহ জোড়া খুন
মামলায় মোট আসামি ১৬ জন। তাদের মধ্যে আটজন বর্তমানে গ্রেফতার আছেন এবং বাকি আটজন পলাতক। পলাতকদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে আশুলিয়া থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হক ট্রাইব্যুনালে দোষ স্বীকার করেছেন। তিনি আদালতে বলেন, “আমরা বড় কর্মকর্তাদের নির্দেশে কাজ করেছি, কিন্তু এখন অনুতপ্ত। আমি সত্য প্রকাশ করতে চাই এবং রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমা চাই।”
তার এই জবানবন্দি আদালত রাজসাক্ষ্য (অ্যাপ্রুভার) হিসেবে গ্রহণ করেছে। তিনি ইতিমধ্যে ঘটনার অনেক গোপন তথ্য ট্রাইব্যুনালে দিয়েছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে।
গ্রেফতার থাকা অন্য আসামিরা হলেন—
১. সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম,
২. ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী,
৩. জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন,
৪. আশুলিয়া থানার সাবেক এস,আই আবদুল মালেক,
৫. আরাফাত উদ্দীন,
৬. কামরুল হাসান,
৭. সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুর রউফ কালবিন্দুকে বলেন, “এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু হত্যার ঘটনা নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি সংগঠিত অপরাধ। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের হাতে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে। আদালত ইতিমধ্যে ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে, যা আসামিদের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।”
এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তাদের মক্কেলরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তারা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “এই মামলার বেশিরভাগ অভিযোগ পুরোনো কাগজের ওপর ভিত্তি করে গঠিত, যার পেছনে কোনো বাস্তব সাক্ষ্য নেই।”
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, মামলাটির তদন্তে দেখা যায়, সাইফুল ইসলাম তৎকালীন সময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ছিলেন এবং তার নির্দেশে আশুলিয়া থানার একদল পুলিশ কর্মকর্তা ও স্থানীয় সহযোগীরা নিরীহ মানুষকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করেন। নিহতদের মধ্যে একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী, দুজন কৃষক, একজন শিক্ষক এবং দুই কিশোর ছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছে, দ্রুতই সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ করে মামলাটির রায় ঘোষণার দিকে এগোনো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলার রায় বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ দমন আইনের বাস্তব প্রয়োগে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
ট্রাইব্যুনালের এক কর্মকর্তার ভাষায়, “এই মামলায় প্রমাণিত হলে, অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। কারণ এটি পরিকল্পিত, পদ্ধতিগত এবং নিষ্ঠুরভাবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ।”

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।