ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি সর্বাত্মক যুদ্ধে নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখন সেই ধাক্কাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ‘বিজয়’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। তবে এই যুদ্ধের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ফলাফল তেল আবিব থেকে ওয়াশিংটন—সবখানেই গভীর ফাটল ও চরম হতাশা তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযান শুরুর ১০৬ দিন পর তেহরান ও ওয়াশিংটন সংঘাতের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটাতে অবশেষে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি চূড়ান্ত সমঝোতা কাঠামোয় পৌঁছেছে, যা বিশ্বমঞ্চে প্রকৃত বিজয়ী ও পরাজিত কে—সেই প্রশ্নটি স্পষ্ট করার পাশাপাশি বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সুপারপাওয়ারের উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে। চার মাসব্যাপী এই যুদ্ধ আমেরিকার সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা এবং তার দীর্ঘদিনের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ (Regime Change) মতবাদের অসারতাকে মারাত্মকভাবে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
কৌশলগত ভুল ও ইরানি বাহিনীর প্রতিরোধ: যৌথ বিমান হামলা শুরুর সময় মার্কিন ও ইসরায়েলি পরিকল্পনাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল প্রথম আঘাতেই তেহরানে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কমান্ডারকে হত্যার মাধ্যমে শীর্ষ নেতৃত্বের পতন ঘটানো। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবিলম্বে এই হামলার ফায়দা তুলতে একে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য হিসেবে ইঙ্গিত করেন এবং ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। কিন্তু ওয়াশিংটন মূলত দুটি বড় কৌশলগত ভুল করেছিল। তারা ভেবেছিল ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া খুবই সীমিত থাকবে এবং প্রাথমিক সামরিক চাপের মুখে তাদের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তারা ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা এবং সেখানকার জনগণের তীব্র স্বাধীনচেতা মনোভাবকে মারাত্মকভাবে ভুল মূল্যায়ন করেছিল।
ইরান দ্রুত তার কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠন করে আয়াতুল্লাহ মুজতাবা খামেনির অধীনে অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখে। ইরান শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং অঞ্চলজুড়ে বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার ড্রোন দিয়ে পাল্টা আঘাত হানে। এই প্রতিরোধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কমান্ডার মেজর জেনারেল আমির হাতামি এবং উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদী স্পষ্ট জানিয়েছেন, আক্রমণকারীদের সব হিসাব ও ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সংঘাতের পর ইরান না পরাজিত হয়েছে, না পিছু হটেছে; বরং এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে চুক্তি করতে বাধ্য করেছে।
মার্কিন রাজনৈতিক মহলে হতাশা ও বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া: আমেরিকার অভ্যন্তরেও এই পরাজয়ের গ্লানি এখন স্পষ্ট। মার্কিন সিনেটর ক্রিস মারফি এক বিস্ফোরক মন্তব্যে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় অর্জন করা সম্ভব ছিল না। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও পররাষ্ট্রনীতির এই ভুলকে তুলে ধরে বলেন, অন্যদেরকে ধমক ও বোমা হামলার মাধ্যমে সমাধান অর্জনের ধারণাটি কাজ করে না। বিপরীতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত খারাপ একটি চুক্তি। ইরানিরা ট্রাম্পকে বেহালার মতো বাজিয়েছে।" ব্রিটিশ পত্রিকা টেলিগ্রাফ এবং বিবিসি স্পষ্ট ভাষায় আমেরিকার সাম্রাজ্যের পতনের ইঙ্গিত দিয়ে লিখেছে—চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ হচ্ছে এবং দেখিয়ে দিচ্ছে আমেরিকার আধিপত্যের সীমা কতটা সীমিত।
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়: মূল ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাটি তখন ইরানের পক্ষে চলে যায়, যখন তারা বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি স্পষ্ট করেছেন, হরমুজ প্রণালী ও ওমান সাগরের নিরাপত্তা এবং ট্রাফিকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতেই থাকবে এবং ইরান সেখান থেকে যথাযথ সেবামূলক ফি বা শুল্ক আদায় নিশ্চিত করবে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতির বোঝা ইতোমধ্যেই আমেরিকানদের ওপর পড়েছে; ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) ২.৪ শতাংশ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৪.২ শতাংশে পৌঁছেছে।
জেনেভা চুক্তি: তেহরানের শর্তে হোয়াইট হাউসের ‘আত্মসমর্পণ’: একটি টেকসই ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প কূটনৈতিকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হন। জেনেভায় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো মূলত তেহরানেরই জয়জয়কার, যা ওয়াশিংটনের একপ্রকার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শামিল:
সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি: ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বহাল রাখা এবং সার্বভৌম অধিকারের অবিলম্বে স্বীকৃতি।
অবরোধ ও সম্পদ মুক্তি: ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইরানি আর্থিক সম্পদের সম্পূর্ণ মুক্তি।
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ: আমেরিকা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ ইরানকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার দিতে রাজি হয়েছে।
হরমুজের টোল: ইরান হরমুজ প্রণালী থেকে ইন্স্যুরেন্স, পরিবেশগত কারণ কিংবা জাহাজের নিরাপত্তা বাবদ টোল বা অর্থ আদায় করবে।
কৌশলগত পরামিতি: ইরানের পারমাণবিক অধিকার এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর তার পরম সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে, যেখানে ইরানের নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কূটনৈতিক এজেন্ডা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের ডিগবাজি ও এক নতুন সুপারপাওয়ারের উত্থান: ওয়াশিংটনের এই আমূল পরিবর্তন ট্রাম্পকে তার বক্তব্য পুরোপুরি উল্টে দিতে বাধ্য করেছে। জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি নাকি কখনোই শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করেননি। এমনকি ইসরায়েল ও নেতানিয়াহু এই চুক্তি মেনে নেবে কি না জানতে চাইলে ট্রাম্প আমেরিকার ওপর ইসরায়েলের সম্পূর্ণ নির্ভরতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তার নিজের সাহায্য ছাড়া ইসরায়েল টিকে থাকতে পারতো না। এ বিষয়ে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন মন্তব্য করেছেন যে, এই চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য চূড়ান্ত আঘাত এবং তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির প্রধান কারণ হতে যাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় সবাই ভেবেছিল ইরান ধ্বংস হয়ে যাবে, অথচ এখন ইরান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ফেরত পাচ্ছে এবং বিশ্ববাসী তার ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ইরান প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে পৃথিবীর পঞ্চম ধনী দেশ। এতকাল নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে তারা অর্থনৈতিকভাবে যেভাবে অবরুদ্ধ ছিল, এখন তা কেটে যাওয়ায় তারা শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও দ্রুততম সময়ে একটি ধনী দেশে পরিণত হবে। আমেরিকান শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপক রবার্ট এ. পেপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১৮ মাসের মাঝেই ইরান পৃথিবীতে এক অপ্রতিরোধ্য ও অলঙ্ঘনীয় ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।