ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দলের অংশগ্রহণে মেক্সিকো ও কানাডার পাশাপাশি মূলত যুক্তরাষ্ট্রে মেগা পরিসরে চলছে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। মাঠের লড়াইয়ে ইতোমধ্যেই জমে উঠেছে বৈশ্বিক এই মহোৎসব; ফুটবলপ্রেমীরা মেতেছেন চমক আর অঘটনের রোমাঞ্চে। তবে মাঠের সেই সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে বিশ্ব রাজনীতির নানা নোংরা বিতর্ক ও আয়োজক মার্কিন প্রশাসনের বৈষম্যমূলক আচরণ এবারের ফিফা বিশ্বকাপে একে দিয়েছে গভীর কলঙ্কের তিলক। বিশেষ করে ইরান দলের কর্মকর্তা ও সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নগ্ন বাধা এবং ম্যাচ শেষ হতে না হতেই তাৎক্ষণিকভাবে খেলোয়াড়দের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাটি ছিল এই বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম নিষ্ঠুরতম ও অমানবিক অধ্যায়। শুধু ইরান নয়; ব্রাজিল, উরুগুয়ে, সেনেগাল ও উজবেকিস্তানের ফুটবলাররাও দেশটিতে প্রবেশ করতে গিয়ে কড়া নিরাপত্তার নামে চরম হেনস্তা ও বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন।
‘নিপীড়িত’ ইরান ও মেক্সিকোর শরণার্থী ক্যাম্প: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে চলতি বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়েই চরম অনিশ্চয়তা ছিল। তবে তেহরান শেষ পর্যন্ত এই আসর বর্জনের সিদ্ধান্ত না নিয়ে স্পোর্টিং স্পিরিট বজায় রাখলেও আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতি চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। গত ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরানের উদ্বোধনী ম্যাচের আগেই শুরু হয় মার্কিন প্রশাসনের ভিসা নাটক। ইরানের মোট ১৫ জনের অফিশিয়াল প্রতিনিধিদল ভিসার জন্য আবেদন করলে প্রথম দফায় সবার আবেদনই নাকচ করে হোয়াইট হাউস। পুনরায় ১০ জন আবেদন করলে তার মধ্য থেকে মাত্র ৪ জনকে ভিসা দেওয়া হয়; যার ফলে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা বিশ্বকাপে আসার সুযোগই পাননি। এমনকি বাতিল করা হয় হাজারো ইরানি সমর্থকের মাঠে প্রবেশের বৈধ অধিকারও।
সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় হলো—ইরান দলকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কোনো ক্যাম্পে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে তারা মেক্সিকোর তিহুয়ানা শহরে অস্থায়ী ক্যাম্প করে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নেয় এবং ম্যাচ খেলার জন্য মাত্র একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পায়। তবে চূড়ান্ত অমানবিক ঘটনাটি ঘটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র হওয়া উদ্বোধনী ম্যাচটির কয়েক ঘণ্টা পর। ম্যাচ শেষের গভীর রাতেই খেলোয়াড়দের হোটেল ছাড়ার ও যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের নির্দেশ দেয় মার্কিন ইমিগ্রেশন। ফলে ম্যাচের ধকল শেষে ন্যূনতম বিশ্রামের সুযোগ ছাড়াই ফুটবলারদের প্রায় দেড়শ কিলোমিটার পথ বাসে ভ্রমণ করে মধ্যরাতে মেক্সিকো সীমান্তে ফিরে যেতে হয়। এ কারণে বিশ্বকাপে নিজেদের সবচেয়ে ‘নিপীড়িত’ দল হিসেবে অভিহিত করেছেন ইরানের কোচ আমির গালেনোই।
সোমালিয়ান রেফারিকে ফিরিয়ে দেওয়া ও ব্রাজিলের জুতা খুলে তল্লাশি: আফ্রিকার সেরা রেহফারি হিসেবে ফিফার অফিসিয়াল প্যানেলে থাকা ৫২ জন রেফারির অন্যতম একজন ছিলেন সোমালিয়ার ৩৪ বছর বয়সী ওমর আরতান। প্রথম সোমালিয়ান হিসেবে বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার এক ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছিল তাঁর সামনে। কিন্তু মার্কিন বর্ণবাদের বলি হয়ে গত ৯ জুন মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই তাকে সোমালিয়ায় ডিপোর্ট বা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র রয়েছে। অন্যদিকে আরতান কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে সোমালিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী ‘আল শাবাব’ নিয়ে অবান্তর প্রশ্ন করা হয়েছিল, যার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও কেবল তাঁর গায়ের রঙ ও দেশের কারণে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি ভেঙে দিয়ে তাকে তুরস্কগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন
ফিফার ওয়ালে বাঙালির ফুটবল উন্মাদনা
এদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও পরাশক্তি ব্রাজিল ফুটবল দলও গত ২ জুন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেই কঠোর ও অপমানজনক নিরাপত্তা তল্লাশির মুখে পড়ে। ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘জার্নাল ও গ্লোবো’ এক প্রতিবেদনে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, নেইমার-ভিনিসিয়ুসদের পুরো বহরকে সাধারণ যাত্রীদের মতোই মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এমনকি বিশ্বের দামি সব তারকা ফুটবলারদের জুতা পর্যন্ত খুলিয়ে এবং ব্যক্তিগত ব্যাগ নিখুঁতভাবে স্ক্যান করে বিমানবন্দরে কয়েক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। অন্যদিকে উরুগুয়ে দলকেও ফিফার কাগজপত্রের জটিলতার দোহাই দিয়ে যথাসময়ে প্রবেশ করতে না দেওয়ায় তারা প্রাক-ম্যাচ অনুশীলনের সুযোগ হারায়।
খোলা আকাশের নিচে সেনেগাল ও কুকুর দিয়ে উজবেক দল তল্লাশি: বিশ্বকাপ শুরুর আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে সেনেগাল ফুটবল দলের সদস্যদের খোলা আকাশের নিচেই টারম্যাকে (রানওয়ের পাশে) দাঁড় করিয়ে তল্লাশির একটি ভাইরাল ভিডিও। সাদিও মানে ও কালিদু কুলিবালির মতো বিশ্বমানের কোটি কোটি ডলারের তারকাদের বিমান থেকে নামিয়ে খোলা রোদে তাদের ব্যক্তিগত মালপত্রের পাশে দাঁড় করিয়ে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ফুটবলপ্রেমীরা অভিযোগ করেছেন, কোনো ইউরোপীয় বা লাতিন দেশের ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য দেখা না গেলেও আফ্রিকান দলের প্রতি এই বৈষম্য কেন? যদিও সেনেগালিজ ফুটবল ফেডারেশন পরে এক বিবৃতিতে জানায়, তল্লাশিটি সান আন্তোনিওতে নামার পর নয়, বরং নর্থ ক্যারোলাইনার বিমানবন্দর থেকে ব্যক্তিগত বিমানে ওঠার সময় করা হয়েছিল; তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই অসংবেদনশীল রূপ তীব্র সমালোচিত হচ্ছে। এছাড়া নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে উজবেকিস্তান দলের খেলোয়াড়দের তল্লাশির জন্য স্নিফার ডগ বা হিংস্র কুকুর ব্যবহার করারও অভিযোগ উঠেছে, যাকে বিশ্ব ফুটবলাররা ‘চরম অপমানজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।





.jpg)












আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।