স্টাফ রিপোর্টার:
ভারতে সাম্প্রতিক সময়ের একটি ধর্মীয় স্লোগানকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে ব্যাপক ধরপাকড়, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ছড়িয়েছে দেশ-বিদেশে। গত সেপ্টেম্বর মাসে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে উত্তর প্রদেশের কানপুর শহরে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা একটি বোর্ড টানানোকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। স্থানীয় কিছু হিন্দু গোষ্ঠী এটিকে "উৎসবে নতুন সংযোজন" হিসেবে দেখিয়ে আপত্তি তোলে। এই ঘটনার জেরে পুলিশ কেবল কানপুরেই নয়, বরং বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে ব্যাপক অভিযান শুরু করে।
অলাভজনক সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস (এপিসিআর) জানিয়েছে, এই ঘটনায় অন্তত ২২টি মামলা হয়েছে এবং ২,৫০০-রও বেশি মুসলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে অন্তত ৪০ জনকে। বরেলিতে ২৬ সেপ্টেম্বর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রেফতার হন ৭৫ জন, যার মধ্যে ছিলেন স্থানীয় ইমাম তৌকির রাজা ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও। ওই এলাকায় অভিযুক্তদের চারটি বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়, যার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগাম নোটিশ বা আদালতের আদেশ ছিল না।
ভারতের সংবিধান আর্টিকেল ২৫ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আর্টিকেল ১৯(১)(এ)-এ মতপ্রকাশের অধিকার সংরক্ষিত। তবে এই ঘটনায় পুলিশ শান্তিপূর্ণ স্লোগানকেও ‘ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি’ ও ‘সর্বজনীন শৃঙ্খলা ভঙ্গ’-এর মতো ধারায় মামলা করেছে। এমনকি টি-শার্ট বা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টের ক্ষেত্রেও এসব ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।
এপিসিআরের জাতীয় সমন্বয়কারী নাদিম খান প্রশ্ন তুলেছেন, “যদি অস্ত্রধারী হিন্দু দেবতাদের ছবি প্রচলিত থাকেই, তাহলে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ স্লোগান হুমকি কীভাবে হয়?” অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আকার প্যাটেল বলেন, এই স্লোগান ঘৃণা-উস্কানিমুক্ত এবং শান্তিপূর্ণ। তিনি মনে করেন, এই ধরণের পদক্ষেপ সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করে।
আরও পড়ুন
৮০ বার ‘যুদ্ধবিরতি’ নাটক: গাজায় আবারও ইসরায়েলি পৈশাচিক হামলা
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদী সরকারের ১১ বছরের শাসনামলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এমন লক্ষ্যভিত্তিক দমন-পীড়ন বেড়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে ঘৃণাত্মক বক্তব্যের ঘটনা ছিল ৬৬৮টি, তা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,১৬৫-তে প্রায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি। এই ঘটনা প্রধানত বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে এবং নির্বাচনের আগে বেড়ে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলি ও রশিদ কিদওয়াই মনে করেন, ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বিতর্কটি ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিশেষ করে মুসলিম তরুণদের লক্ষ্য করে এমন নীতি তাদের মধ্যে হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই তরুণদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক সংকটের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই ঘটনায় ভারত সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।