ঢাকা সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) অভিযোগপত্রে নাম আসা ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
শনিবার দুপুরে সেনানিবাসের স্টাফ রোড মেসে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান। তিনি জানান, হেফাজতে নেওয়া ১৫ কর্মকর্তার মধ্যে ১৪ জন কর্মরত ও একজন অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে (এলপিআর) আছেন।
মেজর জেনারেল হাকিমুজ্জামান বলেন,
“বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় সংবিধান ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা ন্যায়বিচার বা ইনসাফের প্রশ্নে আপসহীন। যে কোনো অভিযোগের সঠিক বিচার আমরা চাই।”
তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনী চায় না যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে সেনা আইনের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করানো হোক। বরং উভয় পক্ষ যেন আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারিক পদ্ধতির মধ্যে থেকেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, সেটিই তাদের অবস্থান।
আরও পড়ুন
ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে ঢাকার ৬০ শতাংশ এলাকা
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই মামলায় ৩০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এই মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম অভিযুক্ত রয়েছেন র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা।
অভিযোগে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দলের রাজনীতিক, কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের গুম, আটক ও নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। প্রসিকিউশন দাখিল করা অভিযোগপত্রে সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার অনেক কর্মকর্তার নাম এসেছে।
মেজর জেনারেল হাকিমুজ্জামান জানান,
“চার্জশিট জমা পড়েছে ৮ অক্টোবর। বেলা ১১টা থেকে ১টার মধ্যে আমরা টিভি স্ক্রল ও সামাজিক মাধ্যমে জানতে পারি ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে একটি ছিল গুমসংক্রান্ত, আরেকটি ছিল র্যাবের টিএফআই সেলের নির্যাতন ইস্যু নিয়ে।”
সেনা সদর জানায়, অভিযোগের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী স্বপ্রণোদিত হয়ে ১৫ কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে তদন্তের স্বার্থে।
হাকিমুজ্জামান বলেন,
“আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ট্রাইব্যুনাল থেকে আনুষ্ঠানিক কপি পাওয়ার পর প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিস্তারিত যাচাই করা হবে।”
তিনি আরও জানান, একজন কর্মকর্তা — মেজর জেনারেল কবির — এখনো সেনা সদরকে সাড়া দেননি।
“৮ অক্টোবর সকালেই তিনি ঘর থেকে বের হন আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার জন্য। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না,” বলেন তিনি।এ কারণে তাকে ‘এডব্লিউওএল’ (Absent Without Leave) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং তার দেশত্যাগ রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে অবহিত করা হয়েছে।
আইসিটির সূত্রে জানা গেছে, র্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে আটক রেখে নির্যাতন মামলায় ১৭ জন এবং জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) বন্দি রেখে নির্যাতনের মামলায় ১৩ জন আসামি করা হয়েছে।
দুই মামলাতেই প্রধান আসামি হিসেবে রাখা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।
অভিযোগে আরও আছেন তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা চার্জশিটের কপি পাওয়ার পর অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা করবে এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।
“ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সেনাবাহিনী কখনো আপস করবে না। তবে আইন ও শৃঙ্খলার ভারসাম্য বজায় রেখে বিচার নিশ্চিত করতে হবে,” বলেন মেজর জেনারেল হাকিমুজ্জামান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সেনা আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নির্ধারণ একটি আইনি ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে সেনা সদর তদন্ত, আইনি পরামর্শ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ—এই তিনটি ধাপে কাজ করছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।