বাংলাদেশের শহর থেকে শুরু করে মফস্বল সব জায়গায়ই ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এক নতুন সামাজিক বিপর্যয়: কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি। অল্প বয়সে অপরাধে জড়িয়ে পড়া এই কিশোরদের দল এখন সমাজের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শুধু নিরীহ মানুষই নয়, ভেঙে পড়ছে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধও।
কিশোর গ্যাং কী এবং কীভাবে গড়ে ওঠে
‘কিশোর গ্যাং’ বলতে বোঝানো হয় এমন একটি কিশোর দলকে, যারা সংগঠিতভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে যেমন মারামারি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ভাড়াটে হামলা বা রাজনৈতিক সহিংসতা। সাধারণত এই দলগুলোর সদস্যদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। প্রথমে তারা বন্ধুদের নিয়ে ছোটখাটো দুষ্টুমি বা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নামে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা অপরাধে রূপ নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার মূল কারণগুলো হলো পারিবারিক অনিয়ম, অভিভাবকদের অমনোযোগ, শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ, সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার। অনেক ক্ষেত্রেই তারা বড়দের গ্যাং থেকে প্রভাবিত হয় বা রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এসব প্ল্যাটফর্ম কিশোর গ্যাং গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ফলোয়ার বাড়ানো’, ‘লাইভে চ্যালেঞ্জ ছোড়া’ বা ‘দেখিয়ে দেওয়া’ সংস্কৃতির মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ভিডিওতে অস্ত্র হাতে বা গ্যাংয়ের নাম নিয়ে ‘হাইপ তোলা’ এখন একধরনের ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন
নেত্রকোনার বারহাট্টায় ভারতীয় শাড়ি ও থান কাপড়সহ ট্রাক আটক, চোরাকারবারি চক্র সক্রিয়
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে ৫০টিরও বেশি সক্রিয় কিশোর গ্যাং শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নতুন সদস্য সংগ্রহ করে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ‘লাইভ’ করে।
শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালেও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে দুই গ্যাংয়ের সংঘর্ষে এক কিশোর নিহত হয়; নারায়ণগঞ্জে ‘ব্লাডি সেভেন’ নামে একটি গ্যাং পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন বলছে, ২০২4 সালে সারাদেশে কিশোর অপরাধের মামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে বড় অংশ জুড়ে আছে গ্যাং–সংক্রান্ত সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা।
মানসিক কারণ ও পারিবারিক ভূমিকা
একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, “কিশোররা স্বীকৃতি চায়, মর্যাদা চায়। গ্যাং তাদের সেই স্বীকৃতি দেয়—যদিও তা অপরাধের মাধ্যমে।”
রাজনীতি ও গ্যাং সংস্কৃতি
আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, অনেক কিশোর গ্যাং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকে। রাজনৈতিক নেতা বা ব্যবসায়ী স্বার্থ রক্ষার জন্য এই কিশোরদের ব্যবহার করেন মিছিল-মিটিং, জমি দখল বা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর কাজে। এতে কিশোররা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, কারণ তারা বিশ্বাস করে “আমাদের কিছু হবে না।”
একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“আমরা অনেক সময়ই দেখি, কিশোর গ্যাং সদস্যরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এতে তারা আরও উৎসাহিত হয়।”
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়
আইনের দৃষ্টিতে কিশোর অপরাধ

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।