আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যাশায় গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আজ শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। দীর্ঘ আট মাসের সংলাপ, মতবিনিময় ও পরামর্শের পর কমিশন এ সনদের চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করেছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর শর্ত ও মতভিন্নতা সনদ স্বাক্ষর প্রক্রিয়াকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আজ বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে উপস্থিত থাকবেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা, কূটনৈতিক মিশনের সদস্য এবং নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা।
বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, দলের প্রস্তাবিত বিষয়গুলো সনদে লিপিবদ্ধ করা হলে তারা স্বাক্ষর করবে। তার ভাষায়, “আমাদের নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) অন্তর্ভুক্ত করা হলে বিএনপি অবশ্যই জুলাই সনদে সই করবে।”
অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বৃহস্পতিবার জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়ন কাঠামো স্পষ্ট না হলে তারা স্বাক্ষর করবে না। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আইনি ভিত্তি ছাড়া সনদে সই করা মানে শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালন করা।”
আরও পড়ুন
ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে ঢাকার ৬০ শতাংশ এলাকা
এদিকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাসদ, জাসদ এবং বাসদ (মার্ক্সবাদী)—এই চারটি বামপন্থি দল স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না। তাদের মতে, সনদে সংবিধানের চার মূলনীতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং বেশ কিছু মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করা হয়েছে।
অন্যদিকে গণফোরাম জানিয়েছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও শেখ মুজিবুর রহমানের টেলিগ্রাম সংক্রান্ত ঘোষণা অন্তর্ভুক্ত না হলে তারাও স্বাক্ষর করবে না।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা আশা করছি, শুক্রবারের অনুষ্ঠানে সব রাজনৈতিক দল উপস্থিত থাকবে এবং স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের পথে আমরা একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করতে পারব।”
তিনি জানান, দীর্ঘ আট মাস ধরে তিন ধাপে আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য ও নোট অব ডিসেন্টসহ চূড়ান্ত সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। কমিশনের মতে, এই সনদ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা।
আজকের অনুষ্ঠান দুই ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। বিকেল ৪টা থেকে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়ে সাড়ে ৪টার দিকে স্বাক্ষর সম্পন্ন হবে। এরপর মাগরিবের নামাজের বিরতির পর দ্বিতীয় পর্বে প্রজেকশন ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে জুলাই সনদ তৈরির পটভূমি ও প্রক্রিয়া প্রদর্শন করা হবে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম, এনসিপি, এলডিপি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, এবি পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ প্রায় ৩০টিরও বেশি দলের প্রতিনিধি স্বাক্ষরের জন্য নাম পাঠিয়েছেন। তবে শেষ মুহূর্তে কিছু দল স্বাক্ষর থেকে সরে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনসিপির নাহিদ ইসলাম বলেন, “জুলাই ঘোষণাপত্রের মতো এবারও আমাদের দাবি—সনদের বৈধতা আসতে হবে জনগণের ভোটের মাধ্যমে। ৮৪টি বিষয়ের ওপর গণভোটের পরই এটি কার্যকর হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা না দেয়, তবে এই সনদ কেবল কাগুজে ঘোষণা হয়ে থাকবে।”
সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানকে ঘিরে সংসদ ভবন এলাকায় ড্রোন উড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, শুক্রবার কোনোভাবেই ওই এলাকায় ড্রোন ওড়ানো যাবে না।
এছাড়া অনুষ্ঠানস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যাব, ডিএমপি ও সংসদ পুলিশ যৌথভাবে মোতায়েন থাকবে। অনুষ্ঠানে প্রবেশে অতিথিদেরকে পূর্বনির্ধারিত আমন্ত্রণপত্র ও আইডি দেখাতে হবে।

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।