বিশ্লেষণী প্রতিবেদন
২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমানের ফলাফল প্রকাশের পর দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে অভূতপূর্ব আলোড়ন। ফলাফল বলছে ১২ লাখ ৩৫ হাজারেরও বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে মাত্র ৭ লাখ ২৬ হাজার, ফেল করেছে ৫ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। পাশের হার ৫৮.৮৩ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম। শুধু তাই নয়, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও নেমে এসেছে অর্ধেকে।
এই বিপর্যয়ের পেছনে দায়ী কেবল ছাত্রছাত্রীদের অদক্ষতা নয় শিকড় অনেক গভীরে, অনেক পুরনো। প্রশ্ন উঠছে: তাহলে কি গত এক যুগের শিক্ষা সংস্কার, উন্নয়ন ও ডিজিটালাইজেশনের প্রতিশ্রুতি ছিল শুধুই শুভঙ্করের ফাঁকি?
এক নজরে ফলাফলের ধস
- ২০২৫ সালের এইচএসসি পাশের হার: ৫৮.৮৩%
- ২০২৪ সালের পাশের হার: ৭৭.৭৮%
- ফেল করেছে: ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১ জন
- জিপিএ-৫ পেয়েছে: ৬৯,০৯৭ জন (২০২৪ সালে ছিল ১,৪৫,৯১১ জন)
বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে নামতে থাকা শিক্ষার মান, রাজনৈতিক প্রভাব, শিক্ষক নিয়োগে অযোগ্যতার ছায়া এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা ঘাটতিরই প্রতিফলন ঘটেছে এই ফলাফলে।
আরও পড়ুন
ঢাকা বোর্ডের এইচএসসি ফলাফল ২০২৫: অনলাইনে ও এসএমএসে সহজেই জানা যাবে ফল
রাজনৈতিক নিয়োগ আর দক্ষতার সংকট
রাজশাহী বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. দীপকেন্দ্র নাথ দাস এর মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার এই ভাঙনের সূচনা হয়েছে বহু আগেই। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা বোর্ড, নীতিনির্ধারণী সংস্থা এবং বিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগগুলো কেবল পদের সংখ্যা পূরণ করেছে, গুণগত মান বাড়ায়নি।
তিনি বলেন:
"যারা শিক্ষানীতি তৈরি করছেন, তারা জানেনই না কীভাবে তা করতে হয়। পরীক্ষকদের ঠিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয় না। শিক্ষকদের কোনো কাঠামোগত প্রশিক্ষণ নেই।"
অর্থাৎ যাদের উপর একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, তারা নিজেরাই অন্ধকারে।
পাঠদান নয়, কোচিং নির্ভরতা
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় পুরোটাই নির্ভর করছে কোচিং সেন্টার এবং গাইড বইয়ের উপর। সরকারি-বেসরকারি অনেক শিক্ষকই ক্লাসে পাঠদান এড়িয়ে চলছেন। সরকারি কলেজগুলোতেও চলছে ব্যাপক স্বেচ্ছাচারিতা।
ড. দীপকেন্দ্র আরও বলেন:
"পড়াশোনাটা কোথাও সেভাবে আর নেই। কোচিং সেন্টারেও এখন আর পড়ানো হয় না, বরং ছাত্রদের বলে দেওয়া হয়—বাসা থেকে পড়ে এসো।"
এই বাস্তবতা যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজের স্কুলে, কলেজে মানসম্পন্ন শিক্ষা পায় না, সেখানে পরীক্ষায় ভালো ফল করবে কীভাবে?
একটি জাতির মানসিক বিপর্যয়
শুধু শিক্ষা নয় এই ধস মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও ভয়াবহ সংকেত দিচ্ছে। প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর পরই দেখা যায় কিছু শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কারণ, সমাজ আমাদের শিশুদের শেখায় “ফেল করলে তুমি ব্যর্থ, তোমার মূল্য নেই।”
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাদিয়া আফরিন বলেন:
“যারা আত্মহননের পথ বেছে নেয়, তারা রিস্ক গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। পরিবারের উচিত ফলাফল ঘোষণার সময় সন্তানের আবেগ, আত্মসম্মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখা।”
স্কুলে যদি ট্রেইনিংপ্রাপ্ত কাউন্সেলর থাকত, তবে শিক্ষার্থীরা ভাঙা মন নিয়ে অন্তত কথা বলার কাউকে পেত।
ভাঙছে বিশ্বাস, বাড়ছে শূন্য ফল
দিনাজপুর বোর্ডে ৪৩টি কলেজ থেকে কেউই পাস করেনি। রাজশাহীতে ৩৫টি কলেজে একই অবস্থা। বরিশালে সংখ্যাটি ১২। সর্বমোট ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। এর মানে দাঁড়ায়—শিক্ষা শুধু বিফল হয়নি, একেবারে ভেঙে পড়েছে।
দিনাজপুরের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যেখানে ২০২৪ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১৪ হাজার ২৯৫ জন, সেখানে এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৬০ জন। পাসের হারও ২০ শতাংশের বেশি কমেছে।
এই বিপর্যয়ের মূল কারণসমূহ
১. রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ: শিক্ষা নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে বোর্ড ও কলেজের প্রশাসনে অদক্ষ ব্যক্তিদের অবস্থান।
- শিক্ষকের অদক্ষতা ও অবহেলা: নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব এবং কোচিং নির্ভরতা।
- নতুন পাঠ্যক্রমের অসামঞ্জস্যতা: হঠাৎ পরিবর্তিত পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতির অস্পষ্টতা ও যথাযথ প্রস্তুতির অভাব।
- ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ব্যর্থতা: এই দুটি বিষয়ের ফলাফলের উপরই সবচেয়ে বেশি ফেল এসেছে।
- কোভিড পরবর্তী শিক্ষার ধাক্কা: কয়েক বছর অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম ও 'বিশেষ প্রক্রিয়ায়' উত্তীর্ণ হওয়ার সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা অর্জন থেকে দূরে রেখেছে।
- মানসিক চাপ ও সামাজিক তুলনার বিষ: অভিভাবকদের অনিয়ন্ত্রিত প্রত্যাশা এবং সমাজের চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
সমস্যা কেবল শিক্ষার্থীদের নয়
যে সমাজে একজন ব্যর্থ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার কথা ভাবে, সে সমাজে শিক্ষা নয়, মূল্যবোধেরও ধস নামে।
পরীক্ষা কেবল একজন শিক্ষার্থীর নয়, পুরো সমাজের একটি আয়না। আর সেই আয়নায় যখন দেখা যায় পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে, তখন বুঝতে হবে সমস্যা ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা।
সম্ভাব্য করণীয় ও সমাধানপথ
১. শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও মেধা ভিত্তিক নিয়োগ
- বোর্ড চেয়ারম্যান, নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনিক পদে রাজনৈতিক প্রভাব নয়, মেধা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে।
২. শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
- প্রত্যেক শিক্ষককে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিতে হবে।
- ক্লাস না নেওয়া শিক্ষককে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রিক শিক্ষা কাঠামো
- স্কুল-কলেজে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সেলর নিয়োগ দিতে হবে।
- অভিভাবকদের সচেতন করতে উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. পরীক্ষা পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা
- বাস্তব ও দক্ষতা ভিত্তিক পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে, যাতে মুখস্থনির্ভরতা কমে আসে।
৫. প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তদারকি জোরদার
- শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে স্বীকৃতি বাতিল।
শেষ কথা: শিক্ষা বিপর্যয় নয়, নীতির বিপর্যয়
এইচএসসি’র ফলাফল কেবল একটি বছর বা একটি ব্যাচের ব্যর্থতা নয়। এটি আসলে আমাদের দীর্ঘদিনের এক নীতিহীনতার প্রতিফলন। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে জিম্মি। শিক্ষকতা থেকে শুরু করে বোর্ড পরিচালনা—সবকিছুতেই অনিয়মের প্রতিফলন ছিল স্পষ্ট। আর তারই ফলাফল আমরা আজ পেয়েছি।
সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষার্থী সবার দায়িত্ব এখন একটাই: শিক্ষাকে ফেরানো মূল ধারায়। পাঠ্যবইয়ে নয়, সত্যিকারের মানুষ গড়ার শিক্ষায়।
না হলে সামনে যে ‘আরও বড় ধস’ অপেক্ষা করছে তা আর কল্পনা নয়, সময়ের ব্যাপার মাত্র
।
















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।