বরিশালের উজিরপুর উপজেলার চাংগুরিয়া গ্রামে অবস্থিত গুঠিয়া মসজিদ — আনুষ্ঠানিক নাম বায়তুল আমান জামে মসজিদ — আজ দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ইসলামী স্থাপত্যের সৌন্দর্য, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং ধর্মীয় মহিমায় এটি শুধু দক্ষিণাঞ্চলের নয়, গোটা বাংলাদেশের গর্ব।
বরিশাল শহর থেকে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার দূরে গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদ। ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ২০০৬ সালে। মসজিদ কমপ্লেক্সটি প্রায় ১৪ একর জমির উপর গড়ে তোলা হয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২০ কোটি টাকা।
মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বরিশালের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। তাঁর উদ্যোগেই “বায়তুল আমান ট্রাস্ট” গঠন করে মসজিদের নির্মাণ ও পরিচালনা শুরু হয়।
গুঠিয়া মসজিদের স্থাপত্যে মোগল আমলের ঐতিহ্য ও আধুনিক কারুকাজের মিশ্রণ রয়েছে। এতে রয়েছে ৯টি গম্বুজ ও ১৯৩ ফুট উচ্চতার একটি প্রধান মিনার, যা দেশের অন্যতম সুউচ্চ মিনারগুলোর একটি। মসজিদের অভ্যন্তরে সূক্ষ্ম আরবি ক্যালিগ্রাফি, কাঁচের নকশা, মার্বেল পাথরের কাজ এবং ঝাড়বাতির আলো এক অপূর্ব আবহ সৃষ্টি করে।
আরও পড়ুন
ভাষানটেক থানা ছাত্রদল কর্তৃক আয়োজিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা লিফলেট বিতরণ।
প্রধান নামাজকক্ষের উপরে থাকা বিশাল গম্বুজটি সাদা ও সোনালী নকশায় সজ্জিত। দেওয়ালজুড়ে খোদাই করা হয়েছে সূরা আর-রহমান-এর ক্যালিগ্রাফি, যা ইসলামী শিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন।
মসজিদের সামনে রয়েছে বড় একটি পুকুর, চারপাশে ফুলের বাগান, ফোয়ারা ও শান বাঁধানো ঘাট। সন্ধ্যাবেলায় আলো-আঁধারির মেলায় পুরো এলাকা যেন এক স্বপ্ন লোকের মতো লাগে। রাতের আলোয় ঝলমল করে উঠে মসজিদের সাদা-সোনালী স্থাপত্য, যা দূর থেকেই চোখে পড়ে।
প্রতি শুক্রবার ও ঈদের জামাতে এখানে হাজারো মুসল্লি অংশ নেন। মসজিদের ভেতরে প্রায় ১,৩৫০ জন এবং বাইরে আরও ৪ হাজারের বেশি মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
গুঠিয়া মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়; এটি একটি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এখানে রয়েছে একটি মাদ্রাসা, এতিমখানা, কবরস্থান, ডাকবাংলো, এবং হেলিপ্যাড। মসজিদ পরিচালনা ট্রাস্ট নিয়মিত ইসলামিক সেমিনার, কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা এবং সমাজসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
প্রধান ইমাম সাহেব বলেন,
“গুঠিয়া মসজিদ শুধু ইবাদতের কেন্দ্র নয়, এটি শান্তি ও নৈতিকতার প্রতীক। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন মনকে প্রশান্ত করতে।”
প্রতিদিনই বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত দর্শনার্থী এখানে আসেন। কেউ নামাজ পড়তে, কেউ স্থাপত্য দেখতে, আবার কেউ শুধুই নীরবতা ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে। ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ মুগ্ধ হয় মসজিদের নান্দনিক পরিবেশে।
যশোর থেকে আসা এক দর্শনার্থী বলেন,
“দেশে এত সুন্দর একটি মসজিদ আছে, না এলে বিশ্বাস করা যায় না। এখানে এসে মনে হয় আত্মা শান্ত হয়।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, দর্শনার্থী বেড়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা নেই। যদি হালকা পর্যটন সুবিধা যেমন খাবার হোটেল ও বিশ্রামাগার তৈরি হয়, তাহলে পর্যটন আরও সমৃদ্ধ হবে।
গুঠিয়া মসজিদ আজ বরিশালের গর্ব, বাংলাদেশের ধর্মীয় ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতীক। শান্ত পরিবেশ, অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্য ও ইসলামী শিল্পকলার সংমিশ্রণ এই মসজিদকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
স্থানীয়দের মতে—“এ শুধু একটি মসজিদ নয়, বরিশালের হৃদয়ের স্পন্দন।”
















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।