এ বছরের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা ত্রুটি ও দুর্বলতা আড়াল করে রাখা হলেও এবার সেই চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংখ্যার খেলায় সাফল্যের মুখোশ পড়ানো হলেও বাস্তবে আমাদের শিক্ষা আজ দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন নাগরিক তৈরির লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বুদ্ধিবৃত্তিক মানের পতন এবং মেধাশূন্যতার যে ধারা তৈরি হয়েছে, এবারের ফলাফল যেন তারই কঠিন প্রমাণ।
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, এ বছর পাসের হার গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। ১০ লাখ ৪৭ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৫ লাখ ৯৮ হাজার যা শতকরা ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এই হার প্রায় ১৯ শতাংশ কম। এর মানে, প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এমন ফলাফলের পেছনে বহু শিক্ষার্থী ভবিষ্যতের দিক হারিয়ে ফেলতে পারে সেটিও অস্বীকার করা যায় না। এ বছরের এসএসসি পরীক্ষাতেও দীর্ঘ ১৬ বছরে সর্বনিম্ন পাসের হার ছিল, ফলে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মানের অবনতি পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান।
ফলাফলের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, শহরের কলেজগুলোর ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে পড়েছে। বহু বছর ধরেই শিক্ষা হয়ে উঠেছে কোচিং, গাইড বই ও প্রাইভেট টিউটরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শিক্ষার খরচ বেড়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন। তাই এইচএসসি ফলাফলের বিপর্যয় কেবল শিক্ষাগত নয় এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলনও বটে।
অন্যদিকে, আন্দোলন ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস হয়নি, যার প্রভাব পড়েছে ফলাফলে। এ বছর উত্তরপত্র মূল্যায়নেও কঠোরতা ছিল বেশি। ইংরেজি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় এটি স্পষ্ট যে, প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তীতে আরও গভীর হচ্ছে। শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর. আবরার যথার্থই বলেছেন আমরা এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি, যেখানে “সংখ্যা”কেই সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়; পাসের হার ও জিপিএ-৫-ই যেন শিক্ষার মানদণ্ড হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন
জাপানের মডেলে প্রাথমিক শিক্ষায় বড় সংস্কার
তাহলে প্রশ্ন হলো, এত শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার দায় কার? শিক্ষার্থীদের, না আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভুল নীতির? বহু বছর ধরে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা এই সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে আসছেন, কিন্তু কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও শিক্ষায় মৌলিক সংস্কারের বদলে কেবল পাঠক্রমে সীমিত পরিবর্তন এনেছে, যা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
সুতরাং, এবারের এইচএসসি ফলাফল কেবল একটি পরীক্ষার ব্যর্থতা নয় এটি আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা ও অচল কাঠামোর প্রতিচ্ছবি। এখন সরকারের মূল দায়িত্ব হলো এসব ত্রুটি শনাক্ত করে বাস্তবমুখী শিক্ষা সংস্কার করা। যারা কৃতকার্য হয়েছে, তাদের অভিনন্দন। আর যারা পারেনি, তারা যেন এই ব্যর্থতাকে শিক্ষা হিসেবে নেয়। ব্যর্থতা কখনো শেষ নয় এটি সফলতার প্রথম ধাপ। তাদের পাশে থাকা, উৎসাহ দেওয়া এবং সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখানোই এখন সমাজ ও অভিভাবকদের প্রধান দায়িত্ব।














আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।