নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
গত কয়েকদিনে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেবল কাকতালীয় নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এ প্রশ্ন এখন জনমনে তীব্রভাবে উত্থাপিত হচ্ছে। বিশেষ করে শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা ও আগুন নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়টি শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
এর মাত্র দুদিন আগেই চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) একটি পোশাক কারখানায় আগুন লেগে পুড়ে যায় পুরো ভবন। একই সপ্তাহে মিরপুরে রাসায়নিক গুদামে আগুন লাগে। এতগুলো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড যদি নিছক দুর্ঘটনাও হয়, তবুও এর পেছনের কারণ উদঘাটন করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে অশুভ কোনো শক্তির পরিকল্পিত ‘অর্থনৈতিক নাশকতা’ লুকিয়ে থাকতে পারে।
কেপিআই স্থাপনায় আগুন: নিছক দুর্ঘটনা?
বিমানবন্দর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি, কেপিআই (Key Point Installation) তালিকাভুক্ত এলাকা। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব ইউনিট থাকার পরও এত বড় অগ্নিকাণ্ড কীভাবে দীর্ঘক্ষণ ধরে চলল সেই প্রশ্ন উঠেছে বারবার।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক (অব.) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহম্মেদ খান বলেন, “এত বড় স্থাপনায় সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকার কথা। আগুন নেভাতে বিলম্ব কেবল ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, বরং এর মধ্যে অন্য কোনো অশুভ উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এসব নাশকতা হতে পারে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ভাঙার চেষ্টা।”
আরও পড়ুন
শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: ৭ ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে, বিমান চলাচল শুরু
অন্যদিকে সাবেক ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শহিদউল্লাহ মন্তব্য করেন, “ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ডে দেশব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এই অবস্থায় আমাদের ভাবতে হবে, দেশের ভেতর বা বাইরে থেকে কেউ পরিকল্পিতভাবে এসব করছে কি না।”
অগ্নিকাণ্ডের ফলে আর্থিক বিপর্যয়
শনিবারের অগ্নিকাণ্ডে কার্গো ভিলেজে মজুত বিপুল পরিমাণ পণ্য পুড়ে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য আমদানি করা কাপড়, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, যন্ত্রাংশসহ দাহ্য মালামাল থাকা অবস্থায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। এতে বিমানের অন্তত ২৩টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থানান্তর করা হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢাকার আকাশপথ বন্ধ থাকে, ফলে যাত্রীসাধারণ ও বিমান সংস্থাগুলোর বড় ধরনের ভোগান্তি ও ক্ষতি হয়।
এক আমদানিকারক এস এম শিহাব উদ্দিন জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫-৬ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “একটি কেপিআই এলাকায় এই ধরনের ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা না-ও হতে পারে। তদন্ত ছাড়া এই বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।”
প্রাথমিক তদন্ত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ
ফায়ার সার্ভিসের বর্তমান ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল জানিয়েছেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় বেশি লাগার কারণ ছিল খোপ খোপ গুদাম ব্যবস্থা, প্রচণ্ড বাতাস, এবং বিস্ফোরক দাহ্য বস্তু। তবে প্রযুক্তিনির্ভর অ্যালার্ম সিস্টেম, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও মহড়ার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত। কোনো গাফিলতি, অবহেলা কিংবা ষড়যন্ত্র থাকলে তা চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের অবস্থান
অগ্নিকাণ্ডের পরে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিমান পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ছয় সদস্যের এ কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশের সব কেপিআই স্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে এবং সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জনমনে আতঙ্ক ও সংশয়
একই সপ্তাহে রাজধানী ও চট্টগ্রামে তিনটি বড় অগ্নিকাণ্ড জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনার পেছনে ‘ষড়যন্ত্র’ কিংবা ‘বহিঃশক্তির মদদে অর্থনৈতিক ধ্বংসের’ সন্দেহ প্রকাশ করছেন। বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এ ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বারবার ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড নিছক দুর্ঘটনা, নাকি অশুভ কোনো শক্তির সুপরিকল্পিত নাশকতা তা খতিয়ে দেখা এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষায় শুধু তদন্ত নয়, প্রয়োজন দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আগাম প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা জোরদার করা। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারেযার দায় আমাদের সবাইকে বইতে হবে।
















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।