স্টাফ রিপোর্টার:
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে গতকাল শনিবার দুপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের পাশে অবস্থিত আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে আগুন লাগে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দফায় দফায় চেষ্টা চালিয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা পর রাত পৌনে ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট বাহিনী।
ঘটনায় আনসার বাহিনীর ২৫ সদস্যসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি ও অন্যান্য সংস্থা।
অগ্নিকাণ্ডের কারণে প্রায় ৬ ঘণ্টা ঢাকার আকাশপথে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকে। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক ফ্লাইট ঢাকা থেকে সরে গিয়ে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমান চলাচল বন্ধ, ফ্লাইট সরানো হয় অন্যান্য শহরে
আরও পড়ুন
ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড: কোন অশুভ বহিঃশক্তি ও অভ্যন্তরীণ অশুভ শক্তির পরিকল্পিত নাশকতা নয়তো ?
বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়। সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, অন্তত ২৩টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঢাকা এড়িয়ে চট্টগ্রাম, সিলেট, কলকাতা, করাচি ও নেপালের বিভিন্ন বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বাংলাদেশ বিমানের একটি কুয়েতগামী ফ্লাইট, হিমালয় এয়ারলাইনসের ঢাকা-নেপাল রুটের ফ্লাইটসহ বহু ফ্লাইট বাতিল বা স্থানান্তর করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক দেখা দেয়।
ভবনের গঠন ও বাতাস—নিয়ন্ত্রণে দেরির কারণ
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল জানান, কার্গো কমপ্লেক্সের ভিতরের স্থাপনা খোপ খোপ ভাগ করা। একেকটি খোপ দেয়াল দিয়ে ঘেরা হওয়ায় প্রতিটি আলাদা করে প্রবেশ করে আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ছিল।
এছাড়া কার্গো কমপ্লেক্সের বাইরের খোলা জায়গায় প্রচুর বাতাস থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। বাতাসের ফলে আগুনে অক্সিজেনের যোগান অব্যাহত ছিল, ফলে আগুন নিভলেও বারবার স্ফুলিঙ্গ দেখা যায়।
কার্গোতে দাহ্য বস্তু ছিল
বিমানবন্দরের একটি সূত্র জানায়, আগুন লাগা কার্গো ভিলেজে তৈরি পোশাক কারখানার জন্য আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাপড় এবং অন্যান্য দাহ্য সামগ্রী মজুত ছিল। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়ায় এবং নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, "এটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ গত কয়েক দিনে একাধিক পোশাক কারখানায় আগুন লেগেছে। বিমানবন্দরের মতো কেপিআইভুক্ত স্থানে এ ধরনের ঘটনা দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকি।"
ক্ষয়ক্ষতি: কে হারাল কতটা?
ওয়ান টাইম কার্গোর বাংলাদেশি এজেন্ট এস এম শিহাব উদ্দিন দাবি করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় পাঁচ-ছয় কোটি টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনায় ব্যবসায়িকভাবে আমদানিকারকদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
একজন কর্মকর্তা জানান, কার্গো ভিলেজে সাধারণত ইলেকট্রনিক পণ্য, পচনশীল সামগ্রী এবং হালকা যন্ত্রাংশ আমদানি করে সংরক্ষণ করা হয়। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরো সময় লাগবে।
তদন্ত কমিটি গঠন
আগুনের ঘটনার পরপরই বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও ঘটনার পেছনে গাফিলতির বিষয় খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশ বিমানের এক অফিস আদেশ অনুযায়ী, ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিমানের ফ্লাইট সেফটি শাখার প্রধানকে। বাকি সদস্যদের মধ্যে রয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়, বিমানের সিকিউরিটি বিভাগ, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইনস্যুরেন্স শাখার প্রতিনিধিরা।
কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
পরপর অগ্নিকাণ্ড, নাশকতার শঙ্কা
গত এক সপ্তাহে মিরপুরে রাসায়নিক গুদামে এবং চট্টগ্রামের ইপিজেডে পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে এই অগ্নিকাণ্ড জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহম্মেদ খান বলেন, “শাহজালাল বিমানবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, যেখানে সার্বক্ষণিক মনিটরিং থাকে। সেখানে এমন বড় অগ্নিকাণ্ড, তাও দীর্ঘ সময় ধরে চলা, এটি কেবল দুর্ঘটনা নয় বলে মনে হয়।”
আরেক সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শহিদউল্লাহ বলেন, “বারবার এমন অগ্নিকাণ্ডের পেছনে নাশকতার সম্ভাবনা খুঁজে দেখা জরুরি। প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরপেক্ষ তদন্ত।”
অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান
এক বিবৃতিতে সরকার জানিয়েছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো নাশকতা বা ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মিললে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
যাত্রীদের দুর্ভোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ঘটনার সময় কার্গো ভিলেজ এলাকায় বিপুলসংখ্যক উৎসুক জনতা ভিড় করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার মাইকিং করে সবাইকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলা হয়।
বিমানবন্দরের এভিয়েশন সিকিউরিটির ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আবু বকর হৃদয় জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে ফ্লাইট চলাচল সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। কার্গো ভিলেজটি রানওয়ের সাথে সংযুক্ত না হলেও ঝুঁকি এড়াতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
উপসংহার
বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এমন অগ্নিকাণ্ড শুধু ক্ষয়ক্ষতির কারণ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও চরম হুমকি। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে যদি গাফিলতির প্রমাণ মেলে, তাহলে তা শুধরে ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
দেশবাসী এখন অপেক্ষায় এই ভয়াবহ ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হবে এবং এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।