কীটনাশকের ভয়াবহতা ও নিরাপদ খাদ্যের চ্যালেঞ্জ
প্রফেসর নোমান ফারুক ও সমীরণ বিশ্বাস
বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা এখন আর শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সাথে জড়িত রয়েছে খাদ্যের মান, পুষ্টিগুণ ও নিরাপত্তা। বাংলাদেশসহ কৃষিনির্ভর দেশগুলোতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এখন বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। কারণ, কৃষকেরা ফসল রক্ষায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, পানির উৎস দূষিত হচ্ছে; অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের রোগ, স্নায়বিক সমস্যা ও প্রজনন জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে।
বাংলাদেশে কীটনাশক ব্যবহার শুরু হয় ১৯৫৩ সালে। সে সময় কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সরকার কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৭২ সালে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল মাত্র ৪ হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২২ সালে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, ৫০ বছরে ব্যবহার দশগুণ বেড়েছে।
অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে কৃষকের খরচ বাড়ছে, মাটির উর্বরতা কমছে, জলাশয় দূষিত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো— খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে মানুষের ক্যানসারসহ জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির অনুমোদন, ব্যয় প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, ক্যানসারে আক্রান্ত কৃষকদের প্রায় ৬৪% নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করার কারণে আক্রান্ত হন। সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার না করায় বিষাক্ত রাসায়নিক সরাসরি শরীরে প্রবেশ করছে। খাদ্যে থাকা অবশিষ্টাংশ শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
· জৈব সার ও জৈব কীটনাশক: ইতিমধ্যে দেশে ১১০টি নিবন্ধিত বায়ো-পেস্টিসাইড অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
· কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ: সরকার ৪০টি ক্ষতিকর কীটনাশক নিষিদ্ধ করেছে।
· সমন্বিত বালাই দমন পদ্ধতি (IPM): বিকল্প পদ্ধতিতে ফসল রক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের উপায়।
· গবেষণা ও উদ্ভাবন: পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার প্রয়োজন।
কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব ও নিরাপদ কৃষি উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা প্রচারে সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ, ফিচার ও টকশোর মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়। একইসঙ্গে ভেজাল ব্যবসা, কোম্পানির অনিয়ম ও সরকারের নিষিদ্ধ তালিকা প্রচারের মাধ্যমেও গণমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। খাদ্য উৎপাদনের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ছে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে। এখন সময় এসেছে “বেশি উৎপাদন নয়, নিরাপদ উৎপাদন”কে অগ্রাধিকার দেওয়ার। কৃষক, ভোক্তা ও দেশের অর্থনীতি— সবাই উপকৃত হবে যদি টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায়।

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।