স্টাফ রিপোর্টার
দেশের বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত রাজনৈতিক দলিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে দেশের মূলধারার বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দল এ অনুষ্ঠান বর্জন করেছে। এই অনুপস্থিতি কেবলমাত্র রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দলগুলোর ভাষ্যমতে, এটি একটি স্পষ্ট বার্তা “আইনি ভিত্তি ও জনগণের স্বার্থ ছাড়া আমরা রাজনৈতিক কাগজে সই করি না।”
অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বামপন্থী চারটি দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ। এদের প্রত্যেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে সনদের খসড়া ও প্রক্রিয়ার নানা অসংগতি ও যৌক্তিক আপত্তির বিষয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন এক সংবাদ বিবৃতিতে বলেন, “আমরা আইনি ভিত্তি ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলিলে স্বাক্ষর করতে পারি না। জুলাই সনদের পেছনে সংবিধানিক বা আইনি কাঠামো না থাকায় এটি প্রতারণামূলক ও সময় নষ্ট করার প্রচেষ্টা হতে পারে।”
আরও পড়ুন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ৬ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “কিছু রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় ঐকমত্যের’ নামে জনগণের সঙ্গে তামাশা করছে। তারা জানে না, একটি কাগজে সই করার মানে কী, যদি সেটার বাস্তবায়নের কোনো আইনগত নিশ্চয়তা না থাকে।”
এ বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট, এনসিপি শুধু অনুষ্ঠান বর্জন করেনি, বরং এর মৌলিক কাঠামো এবং উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বামপন্থী দলগুলোর যুক্তি: ‘খসড়ার চূড়ান্ত রূপ না পেলে সই নয়’
বাম ধারার চারটি রাজনৈতিক দল সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ একইসঙ্গে অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্ত জানায়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির বলেন, “আমরা আগেই (১৬ অক্টোবর) আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। সংশোধিত খসড়া হাতে না পেলে এমন একটি ঐতিহাসিক সনদে স্বাক্ষর করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক।”
বাম দলগুলোর আরও অভিযোগ, তাদের দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পরামর্শগুলো সনদের মূল খসড়ায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বিশেষ করে
- দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা,
- সংবিধানের বিতর্কিত ধারা সংশোধন,
- শ্রমিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ,এইসব বিষয়ে তাদের সুপারিশ বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ।
এ বিষয়ে বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, “একটি কাগজে সই করে ফটোসেশনে গেলে আমরা জনগণের কাছে দায়ী থাকবো। আমরা স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ খসড়া ছাড়া এই প্রহসনের অংশ হতে পারি না।”
জুলাই যোদ্ধাদের বিক্ষোভ: অনুষ্ঠানেই ফাটল ধরাল গণপ্রতিরোধকারীরা
এই বর্জনের পাশাপাশি, অনুষ্ঠানস্থলে ঘটেছে আরেক বড় চমক। জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ছাত্র-জনতা, যারা নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দেন, তারা অনুষ্ঠানস্থলের ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের দাবি
- আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি,
- জুলাই সনদে তাদের ভূমিকার স্বীকৃতি,
- সনদকে স্থায়ীভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।
এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, পুলিশ লাঠিচার্জ করে, সংঘর্ষ হয়, ভাঙচুর চলে এবং এরপর প্রশাসন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে সনদের পঞ্চম দফা সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হয়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ পরে বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের দাবির আলোকে আমরা সনদের পঞ্চম দফায় স্বীকৃতি ও সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করছি। এই সংশোধনই চূড়ান্ত সনদে থাকবে।”
জুলাই সনদে অংশ না নেওয়ার পেছনে মূল যৌক্তিক কারণগুলো
উপস্থিত না হওয়া দলগুলোর ভাষ্য বিশ্লেষণ করলে কিছু সাধারণ যৌক্তিক ভিত্তি স্পষ্ট হয়:
১. আইনি ভিত্তির অভাব:
বেশ কয়েকটি দল উল্লেখ করেছে, এই সনদের বাস্তবায়নে কোনো আইনগত গ্যারান্টি নেই। এটি একটি প্রতীকী দলিল মাত্র যা রাজনৈতিক চাপ বা ভবিষ্যৎ সরকার ইচ্ছেমতো অস্বীকার করতে পারে।
২. খসড়ার স্বচ্ছতা ও পর্যালোচনার সুযোগ না থাকা:
বামপন্থী দলগুলো জানায়, তারা চূড়ান্ত খসড়া হাতে না পাওয়ার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আলোচনার সুযোগের অভাব ও খসড়ার নীতিগত দুর্বলতা তাদের উদ্বিগ্ন করেছে।
৩. সংগঠনের মতামত উপেক্ষা:
এনসিপি এবং সিপিবি উভয় দলই দাবি করেছে, তাদের দলের দেওয়া প্রস্তাবগুলোর প্রতি অবজ্ঞা করা হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ইত্যাদি ইস্যুতে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
৪. জুলাই যোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তি না থাকা:
যে আন্দোলনের রক্তে জন্ম হয়েছে জুলাই সনদের, সেই আন্দোলনের যোদ্ধারাই অবহেলিতএটি অনেক রাজনৈতিক দলের মতে চরম অসম্মান ও দায় এড়ানোর কৌশল।
ঐকমত্য না থাকলে ঐকমত্য সনদ?
‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ নামটি শুনতেই যেন একটা জাতীয় ঐক্যের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ৬৩টি দলের মধ্যে অনেকেই এখনো সংশয় বা অনাস্থা প্রকাশ করছে। অনেকে পরবর্তীতে সই করতে পারে বললেও এই ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিলের জন্য শুরুতেই সার্বজনীন সমর্থন আবশ্যক ছিল বলে মত বিশ্লেষকদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আরিফ হোসেন বলেন, “সনদে স্বাক্ষর না করা দলগুলোর অবস্থান যদি যৌক্তিকভাবে দেখা হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট, স্বচ্ছতা, অন্তর্ভুক্তি ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনার অভাব ছিল। এটি যদি শুধুই রাজনৈতিক শোভাযাত্রা হয়, তবে তা দেশে স্থায়ী পরিবর্তন আনবে না।”
যদিও অনুষ্ঠানের দিনেই সনদের একাধিক ধারায় সংশোধনের ঘোষণা এসেছে, তবুও এতে অংশ না নেওয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে যুক্ত করার কাজ এখনো অসমাপ্ত।
অনুষ্ঠানে না অংশ নেওয়া দলগুলো বারবার বলেছে “আমরা কাগজে নয়, কাজে বিশ্বাস করি।” সেই কাজ কীভাবে হবে, সেটি এখন নির্ভর করছে সংশোধিত সনদ, অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়া এবং আইনগত ভিত্তির ওপর।অন্যথায়, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর গায়ে লেগে থাকবে ঐকমত্যহীন এক ঐক্যের ছাপ।

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।