বিশেষ প্রতিবেদন
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক গভীর সংকটে,। রাজপথে হাজার হাজার শিক্ষক; ক্লাসরুমে নেই পাঠদান। সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি শিক্ষক-কর্মচারী বর্তমানে আন্দোলনে নেমেছেন তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে। ফলে অচল হয়ে পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকারি কলেজেও ক্লাস বন্ধ। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
দাবি কী? কেন আন্দোলন?
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং উৎসব ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন। বর্তমানে তারা মাসে মাত্র ১,০০০ টাকা বাড়িভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান যা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের প্রেক্ষাপটে অপ্রতুল ও অসম্মানজনক। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস বারবার দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি কোনো দাবি। সর্বশেষ গত ৫ অক্টোবর, শিক্ষক দিবসে অর্থ মন্ত্রণালয় মাত্র ৫০০ টাকা বাড়িভাড়া ভাতা বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন দিলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষকরা।
কর্মসূচি এবং প্রতিক্রিয়া
১২ অক্টোবর থেকে রাজধানীর প্রেস ক্লাব ও শহীদ মিনারে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। তারা ক্লাস বর্জন করেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন, দাবি না মানা পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। এমনকি ‘লং মার্চ টু সচিবালয়’ কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। এই পরিস্থিতিতে পুলিশি হামলা, শিক্ষক লাঞ্ছনা ও গ্রেফতারের ঘটনা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তুলেছে। সরকার পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না আসায় শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
শুধু এমপিওভুক্ত শিক্ষকই নয়, অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের মধ্যেও। সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ নিয়ে জটিলতা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ভেঙে দুটি নতুন অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগে ক্ষুব্ধ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা। এতে ১৪ অক্টোবর থেকে দেশের সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
সহকারী শিক্ষকদের তিন দফা দাবিতে অনশন কর্মসূচি স্থগিত: আশ্বাসে সন্তুষ্ট শিক্ষকরা
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যতদিন দাবি মানা না হবে, ততদিন তারা ক্লাসে ফিরবেন না। এই আন্দোলন এখন আর কেবল বাড়িভাড়ার বিষয় নয়; এটি পরিণত হয়েছে শিক্ষক মর্যাদা, পেশাগত নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার আন্দোলনে।
প্রাথমিক শিক্ষকরাও অনশনরত
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার দাবিতে ১৭ অক্টোবর থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। বর্তমানে তারা ১৩তম গ্রেডে বেতন পান, যা তাদের যোগ্যতা ও কাজের পরিপ্রেক্ষিতে অযৌক্তিক মনে করছেন শিক্ষকরা। এর আগে টানা এক মাস কর্মবিরতি করেও কোনো ফল না পেয়ে তারা এবার অনশন নামক চূড়ান্ত কর্মসূচি বেছে নিয়েছেন।
শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ: ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে শিক্ষা ব্যবস্থা
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও দেশের শিক্ষকদের ‘কোমর সোজা করে দাঁড়াতে’ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “যে জাতির শিক্ষক আর্থিকভাবে ভঙ্গুর, সে জাতি কীভাবে উন্নত নাগরিক তৈরি করবে?” তার মতে, বর্তমান অবস্থা শুধু শিক্ষকদের অপমান নয়, বরং এটি জাতীয় মেরুদণ্ড ভাঙার পূর্বাভাস।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী প্রধান বলেন, “শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান ও পারিশ্রমিক না থাকায় তারা পাঠদানের চেয়ে প্রাইভেট টিউশনে মনোযোগ দিচ্ছেন। এতে শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “বছরের অধিকাংশ সময় শিক্ষকরা আন্দোলনে থাকেন, বই পেয়েছে এপ্রিল-মে মাসে তাহলে ক্লাস কয়দিন হয়েছে? শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি ছাড়াই পরীক্ষা দিচ্ছে, কেউ কেউ ফেল করে ঝরে যাচ্ছে।”
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। সামনে বার্ষিক পরীক্ষা, অথচ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই ক্লাস নেই। পাঠ্যসূচি অসম্পূর্ণ, প্রস্তুতির অভাব প্রকট। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে জাতির সার্বিক শিক্ষাগত অর্জনে। শিক্ষার মানের এই অবনতিকে এক ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একদিকে কোচিং নির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গিয়ে চিন্তা করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
সরকারের ভূমিকা
সরকারের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা কিংবা শিক্ষা উপদেষ্টা কেউই প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করছেন না। আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ খুবই সীমিত। অর্থ মন্ত্রণালয়ও নিরব। জনসংযোগ কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা উপদেষ্টা দাবিগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছেন, এখন বাকি দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু শিক্ষক নেতারা বলছেন, এটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা “প্রতিশ্রুতি-বাণিজ্য” ছাড়া কিছুই নয়।

















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।