নিজস্ব প্রতিবেদক | কালবিন্দু
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের আলোচিত ছয়টি ইসলামি দল এবার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নেমেছে। তারা অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation-P.R.) পদ্ধতিতে নির্বাচন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি বাস্তবায়ন, এবং নির্বাচনি আসনসমূহে সমঝোতার মাধ্যমে প্রার্থী নির্ধারণসহ পাঁচ দফা দাবি নিয়ে যৌথ কর্মসূচি শুরু করেছে।
এই ছয়টি দল হলো—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং ইসলামী রাজনৈতিক ঐক্য পরিষদ। তারা সবাই বর্তমানে “একক ভোটব্যাংক” গঠনের প্রচেষ্টায় যুক্ত রয়েছে, যার মাধ্যমে ইসলামি ভোট এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন ইসলামি দলের নেতারা নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান ও সংগঠনভিত্তিক শক্তি অনুযায়ী আসন ভাগাভাগির বিষয়ে আলোচনায় বসেছেন। জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সম্প্রতি খুলনায় এক অনুষ্ঠানে বলেন,
“আমরা ৩০০ আসন চূড়ান্ত রেখেছি, তবে যেখানে জয়ের সম্ভাবনা কম বা কখনও নির্বাচন করিনি, সেখানে সর্বোচ্চ ১০০ আসন ছাড় দিতে পারি। সমমনা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যের মাধ্যমে সমঝোতা করেই প্রার্থী চূড়ান্ত হবে।”
আরও পড়ুন
আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে ঐক্যের বিকল্প নেই
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এক নেতা কালবিন্দুকে বলেন,
“বরিশালে আমাদের সংগঠন শক্তিশালী, তাই সেখানে হয়তো জামায়াত প্রার্থী দেবে না। আবার কক্সবাজার বা পাবনায় জামায়াতের অবস্থান ভালো, সেক্ষেত্রে আমরা প্রার্থী দেব না। সবাই সমঝোতার ভিত্তিতেই নির্বাচনে নামবে।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আহমাদ বলেন,
“প্রার্থিতা নির্ধারণে দেখা হবে—কোন আসনে কোন দলের সাংগঠনিক শক্তি বেশি, প্রার্থীর মান ও জনসমর্থন কেমন। তফসিল ঘোষণার আগেই আসন ভাগাভাগির সব কাজ শেষ করতে চাই আমরা।”
ইসলামি দলগুলোর অন্যতম দাবি হলো—দেশে অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর ভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করা। এতে জনগণের ভোট সরাসরি সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাবে এবং ছোট রাজনৈতিক দলগুলোরও সংসদে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে।
ছয় ইসলামি দলের দ্বিতীয় বড় দাবি হলো জুলাই সনদের আইনি রূপদান। এই সনদে নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক সংস্কার, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুনর্গঠনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
তারা মনে করে, জুলাই সনদ কার্যকর করা হলে নির্বাচন হবে “জাতীয় ঐক্য ও বিশ্বাসের পরিবেশে”, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালউদ্দিন আহমদ বলেন,
“ছোট দলের প্রার্থীরা এলাকায় দুর্বল হলেও আমির বা কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। না হলে ঐক্য নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে।”
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন সমঝোতা বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন হবে যদি প্রতিটি দলের সাংগঠনিক স্বার্থ ও প্রার্থীস্বরূপ সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা না যায়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামি দলগুলোর এই নতুন ঐক্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণ তৈরি করতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামি রাজনীতি কখনও ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটের মাঠে নামেনি; এবার যদি সত্যিই একক প্ল্যাটফর্মে প্রার্থী দেওয়া যায়, তবে তা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
অন্যদিকে, নির্বাচনী আইন পরিবর্তন বা পিআর পদ্ধতি কার্যকর করতে হলে সংবিধানের সংশোধন প্রয়োজন, যা বর্তমান সংসদের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে এই দাবিগুলো এখনো রাজনৈতিক আলোচনার পর্যায়ে আছে।
ছয় ইসলামি দলের এই যুগপৎ আন্দোলন শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো বদলের একটি প্রচেষ্টা। পিআর পদ্ধতি ও জুলাই সনদের আইনি স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, আর এর মাঝেই আসন ভাগাভাগির প্রস্তুতি রাজনৈতিক মাঠে নতুন উত্তাপ তৈরি করছে।
এখন প্রশ্ন—এই ঐক্য কতটা স্থায়ী হবে, আর জনগণের ভোটের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে—সেটাই নির্ধারণ করবে আগামী নির্বাচনের বাস্তবতা।
















আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের জন্য লগইন
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিমালামন্তব্য করতে লগইন করুন
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্য করুন।